অক্ষয় তৃতীয়া: অনন্তের বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

হস্তিনাপুরে কৃষ্ণমূর্তির পদচিহ্ন সম্বলিত মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বারছবি: উইকিপিডিয়া

‘অক্ষয়’—শব্দটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক গভীর দার্শনিক তাৎপর্য; যার ক্ষয় নেই, যা অনন্ত, যা চিরস্থায়ী। এই ধারণাকেই কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মজীবনে এক বিশেষ তিথির আবির্ভাব—অক্ষয় তৃতীয়া।

বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি এই নামে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিনে সম্পাদিত যে কোনও শুভকর্ম অক্ষয় ফল দান করে, অর্থাৎ তার সুফল দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত থাকে।

অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরাণ, আখ্যান ও লোকবিশ্বাসের এক সমৃদ্ধ সংমিশ্রণ। বিভিন্ন পুরাণে এই তিথির গুরুত্ব নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মৎস্য পুরাণে অক্ষয় তৃতীয়াকে বছরের অন্যতম পবিত্র দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে ভক্তদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আচারের কথা বলা হয়েছে—বিষ্ণুকে নৈবেদ্য নিবেদন, ব্রাহ্মণদের আহার প্রদান এবং পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল, ফল ও মিষ্টি অর্পণ। এইসব কর্মের মধ্য দিয়ে অর্জিত পুণ্যকে ‘অক্ষয়’ বলে গণ্য করা হয়।

স্কন্দ পুরাণে পাওয়া যায় ইন্দ্রের এক তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনি। ঋষির অভিশাপে শক্তিহীন হয়ে ইন্দ্র যখন আত্মগোপনে ছিলেন এবং দেবলোক দৈত্যদের অধিকারে চলে যায়, তখন দেবতাদের উপদেষ্টা বৃহস্পতির নির্দেশে ইন্দ্র অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ব্রত, দান ও পূজা সম্পাদন করেন।

অনেকে মনে করেন, এই দিনেই মহাভারত রচনার সূচনা হয়েছিল—ঋষি ব্যাস মুখে মুখে কাব্যটি উচ্চারণ করেন এবং গণেশ তা লিখে রাখেন।
আরও পড়ুন

এর ফলেই তিনি তাঁর হারানো শক্তি ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেন। এই আখ্যান অক্ষয় তৃতীয়াকে কেবল পুণ্যলাভের দিন নয়, পুনরুজ্জীবন ও পুনরুদ্ধারের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।

এই তিথিকে ঘিরে আরও কিছু বহুল প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই দিনেই মহাভারত রচনার সূচনা হয়েছিল—ঋষি ব্যাস মুখে মুখে কাব্যটি উচ্চারণ করেন এবং গণেশ তা লিখে রাখেন।

আবার, গণেশের জন্মতিথি হিসেবেও অক্ষয় তৃতীয়াকে মানা হয়। ফলে এই দিনে গণেশপূজা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

একইসঙ্গে, ধনদেবতা কুবেরের সঙ্গেও এই দিনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, কঠোর তপস্যার ফলে এই দিনেই তিনি মহাদেবের কাছ থেকে অসীম ধনসম্পদ লাভ করেন বা দেবলোকের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

অক্ষয় তৃতীয়া আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঘটনার সঙ্গেও যুক্ত। গঙ্গার স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অবতরণ এই দিনেই ঘটেছিল বলে মনে করা হয়, যা এই তিথিকে শুদ্ধি ও পবিত্রতার প্রতীক করে তোলে।

ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্মতিথিও এই দিন। আবার, হিন্দু যুগচক্র অনুযায়ী ত্রেতা যুগের সূচনাও অক্ষয় তৃতীয়াতেই হয়েছিল বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

এইসব পুরাণকথা ও বিশ্বাসের সমন্বয়ে অক্ষয় তৃতীয়া একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক, তেমনই সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই দিনে সোনা ও রুপো কেনার প্রথা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

আরও পড়ুন
অক্ষয় তৃতীয়া কেবল একটি ধর্মীয় তিথি নয়; এটি এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, যেখানে পুরাণ, বিশ্বাস, আচার এবং সামাজিক চেতনা একসূত্রে গাঁথা।

পাশাপাশি, দান-ধ্যান—যেমন দরিদ্রদের খাদ্য ও বস্ত্র প্রদান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা—এই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত পুণ্যসঞ্চয়ের পাশাপাশি সামাজিক সহমর্মিতার এক সুন্দর প্রকাশ ঘটে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অক্ষয় তৃতীয়া ভিন্ন ভিন্ন আচার ও প্রথার মাধ্যমে পালিত হয়, যা এই উৎসবের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। ওড়িশায় এই দিনে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার রথ নির্মাণের সূচনা হয় এবং কৃষকেরা ধান বপনের কাজ শুরু করেন।

পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ উদ্‌যাপনের মাধ্যমে নতুন হিসাবের খাতা খোলেন এবং লক্ষ্মীপূজা করেন। মহারাষ্ট্রে বিবাহিত নারীরা ‘হলদি-কুমকুম’ বিনিময় করে দাম্পত্যকল্যাণ কামনা করেন।

বৃন্দাবনের বাঁকে বিহারী মন্দিরে এই দিনে কৃষ্ণমূর্তির চরণদর্শনের বিরল সুযোগ দেওয়া হয়, যা ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। তামিলনাড়ুতেও এই তিথি বিশেষভাবে পালিত হয়—বিষ্ণুমন্দিরে পূজা, ব্রাহ্মণভোজন এবং দানের মাধ্যমে ভক্তরা এই দিনকে পবিত্র করে তোলেন। 

সব মিলিয়ে অক্ষয় তৃতীয়া কেবল একটি ধর্মীয় তিথি নয়; এটি এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, যেখানে পুরাণ, বিশ্বাস, আচার এবং সামাজিক চেতনা একসূত্রে গাঁথা।

‘অক্ষয়’-এর যে চিরন্তন ধারণা, তা এই দিনের প্রতিটি আচারে, প্রতিটি বিশ্বাসে প্রতিফলিত—মানুষের আশা, আস্থা ও শুভকামনার এক অনিঃশেষ প্রতীক হয়ে।

আরও পড়ুন