মানবমনের জয়মাল্য গাঁথা হয় দোলযাত্রায়
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, বসন্তকালে রঙের উৎসবকে বাঙালিদের হোলি বলা উচিত নয়; বরং বলা উচিত দোল উৎসব।
ভারতীয় উপমহাদেশে যে ক’টি উৎসব মোটামুটিভাবে এই ভূখণ্ডের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একযোগে উদযাপন করে থাকে তার মধ্যে ফাল্গুনের পূর্ণিমা তিথির এই রঙিন উৎসবটি অন্যতম তো বটেই, বরং বলা যায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এই দোল উৎসব।
তবে কেন একে হোলি বলা হয়, বিশেষ করে ভারতবর্ষের হিন্দিবলয়ে তার একটি ঐতিহাসিক কাহিনী আছে।
এই আখ্যানে আছে দানবী হোলিকার কথা। এই গল্পটি বিষ্ণুভক্ত দৈত্য প্রহ্লাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হোলিকার পরিচয় সে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর বোন এবং প্রহ্লাদের পিসি। হোলিকা শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে খেয়ে ফেলত। শিশুমাংস নাকি তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল।
কথিত ছিল হোলিকাকে আগুন ছুঁতে পারবে না। তাই শিশু ভাইপো প্রহ্লাদকে আগুনে দগ্ধ করার উদ্দেশ্যে তাকে কোলে নিয়ে হোলিকা আগুনের মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু তার এই ধারনা ভুল প্রমাণিত হয়। বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যায়। হোলিকার মৃত্যু ঘটে।
মহাদেব ধ্যানভঙ্গের পর চোখ মেলে তাকান। দেখতে পেলেন কামদেব মদনকে। তাঁকে দেখেই রেগে জ্বলে উঠলেন তিনি। চোখের ক্রুদ্ধ চাহনিতে ভস্ম করে দিলেন মদনকে।
অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে দোলের আগের দিন সন্ধ্যায় ‘হোলিকা দহন’ পালন করে থাকে অবাঙালিরা। প্রাজ্ঞজনেরা মনে করেন, এই দহন প্রতীকী।
বসন্তকালের নানা রোগজীবাণুকে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে সুস্থ নাগরিক জীবন বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করার একটি সামাজিক প্রতীকী কাহিনী। আসলে এই সময়ে শিশুদের নানা রকমের রোগ হতে দেখা যায়।
যদিও পুরাণে আরেকটি গল্পও বিধৃত রয়েছে। সেটি কামদেব মদনকে নিয়ে। এককালে স্বর্গে অসুররা প্রবল অত্যাচার করতে শুরু করলে দেবতাদের মধ্যে ভয় দেখা দেয়। তাঁরা অসুরদের অকথ্য অত্যাচার থেকে মুক্তির আশায় শিবের শরণাপন্ন হলেন। ধ্যান করতে বসে গেলেন ইন্দ্রসহ ব্রহ্মা আর বিষ্ণুও।
এদিকে শিব তখন নিজেও ধ্যানে মগ্ন। তাঁর ধ্যান না ভাঙলে তিনি সাড়া দেবেন কেমন করে। ফলে তাঁর ধ্যান ভাঙানোর চেষ্টায় মৌমাছির দল চলে আসে চারদিকে। তাদের গুনগুন আর পাখির কলরব যাতে শিবের ধ্যানে ব্যাঘাত না ঘটায় তারজন্য শিবের সহচর নন্দী পাহারারত।
তিনি মৌমাছির আর পাখির দলকে তাড়াতে গিয়ে খেয়ালহীনভাবে বনের মধ্যে অনেকটা দূরেই চলে যান। এই সুযোগে রতিকে সঙ্গে নিয়ে কামদেব মদন সেখানে উপস্থিত হন। ফাঁকা পেয়ে পুষ্পশর ছুঁড়তে যাবে যেই, অমনি মহাদেব ধ্যানভঙ্গের পর চোখ মেলে তাকান। দেখতে পেলেন কামদেব মদনকে। তাঁকে দেখেই রেগে জ্বলে উঠলেন তিনি। চোখের ক্রুদ্ধ চাহনিতে ভস্ম করে দিলেন মদনকে।
এদিকে চোখের সামনে মদনকে ভস্ম হতে দেখে রতি কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্নায় চারদিক কেঁপে ওঠে, সে কান্না স্বর্গে ইন্দ্রের কাছেও পৌঁছোয়। তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন, মনও গলে গেল তাঁর। রতিকে সান্ত্বনা দিতে তিনি বর দিলেন। বরটি ছিল— দ্বাপর যুগে কৃষ্ণের পুত্র হিসেবে কামদেবকে রতি ফিরে পাবে।
এদিকে মহাদেবের অনুচর শ্মশানবাসী ও বনবাসীরা আনন্দে নাচতে-গাইতে থাকে। সেদিনটি ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি। শিবের অনুচর প্রমথেশ ঘোষণা করল প্রতিবছর এই মদন ভস্মের স্মৃতিতে পবিত্র বহ্ন্যুৎসব পালন করা হবে। ফাগুনের রঙের আগুনেই যেন কাম দহনে শুদ্ধ হয় মানুষ।
যদিও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, মদনদহন একটি প্রতীকী ঘটনা। শিবের রোষানলে দগ্ধ কামদেবের ঘটনাটির ব্যাখ্যায় তাদের মত উদ্দাম রঙের উৎসবে উন্মত্ত মানুষের কামনাবাসনার প্রকাশকে দমন করার জন্যই আগুনের এই কাল্পনিক ব্যবহার।
আকবরের সময় থেকে এই উৎসব দিল্লির রাজপ্রাসাদে বিশেষ মর্যাদা পায়। সম্রাট আকবর হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় উৎসবের প্রতি খুবই সহিষ্ণু ছিলেন এবং নিজেও সাড়ম্বরে উৎসবে যোগ দিতেন।
তবে ইয়োরোপীয়দের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, রঙের এই উৎসবে নিম্নবর্গের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অনেকরকমের যৌন-উদ্দীপক অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করত। দোল পূর্ণিমার আগের রাতে পাড়ায় পাড়ায় ‘বুড়ির ঘর’ পোড়ানোর চল রয়েছে। কোথাও কোথাও এই চাঁচর উপলক্ষে জীবন্ত মেড়া বা ভেড়া পোড়ানোও হত অতীতে। তাই একে অনেকে ‘মেড়ার ঘর’ পোড়ানোও বলে থাকে। এছাড়াও কলাগাছ, ভেরেণ্ডা প্রভৃতি পোড়ানোও হয়ে থাকে।
তবে, এখন এই প্রাচীন রীতিকে অবলম্বন করে খড়ের কুশপুতুল বানিয়ে পোড়ানোটাই মুখ্য হয়ে গেছে। জনশ্রুতি ‘বুড়ির ঘর’-এর আগুনের শিখার উচ্চতা দেখে লোকের বিশ্বাস জন্মায় যে, সে-বছর চাষবাস ভালো হবে। এবং ‘বুড়ির ঘর’ পোড়ানোর পর তার ছাই ঘরে রাখলে চাষীর মঙ্গল হয় এই বিশ্বাসেরও চল কৃষিপ্রধান দেশের গ্রামাঞ্চলে রয়েছে।
এছাড়াও মুঘল আমলে রং খেলার কথা জানা যায়। মুঘল সাম্রাজ্যে দোলযাত্রা বা হোলি ছিল এক আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমন্বয়ের নিদর্শন। ইসলামী শাসক হওয়া সত্ত্বেও মুঘল সম্রাটেরা ভারতীয় উপমহাদেশের বহু সনাতনী আচার–অনুষ্ঠানকে রাজদরবারে নানা উৎসব উদ্যাপনের মাধ্যমে সম্মান করতেন। দোল বা হোলি তার অন্যতম।
আকবরের সময় থেকে এই উৎসব দিল্লির রাজপ্রাসাদে বিশেষ মর্যাদা পায়। সম্রাট আকবর হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় উৎসবের প্রতি খুবই সহিষ্ণু ছিলেন এবং নিজেও সাড়ম্বরে উৎসবে যোগ দিতেন। ফতেহপুর সিক্রি ও আগ্রা দুর্গে রাজপরিবার ও অন্তঃপুরে রং খেলার উল্লেখ সমকালীন নানা দলিলে পাওয়া যায়।
আকবরের হিন্দু রানিরা, বিশেষত জোধাবাই রাজদরবারে হোলি উদ্যাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন। রঙিন আবির, সুগন্ধি জল এবং সঙ্গীত–নৃত্যের মাধ্যমে সে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
জাহাঙ্গীরের আমলেও রং খেলার চিত্র মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলায় ধরা পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর ও নূরজাহান রঙে রঙে রঙিন হয়ে আমোদ–প্রমোদে মত্ত। আবুল ফজল বা জাহাঙ্গীরনামার বর্ণনায় সরাসরি হোলির বিশদ বিবরণ না থাকলেও দরবারি জীবনের চিত্রে এই উৎসবের বর্ণনা স্পষ্ট।
শাহজাহানের সময়েও রাজপ্রাসাদে বসন্তোৎসব ও রঙের খেলার চল ছিল, যদিও তা ছিল নিয়ন্ত্রিত ও আভিজাত্যপূর্ণ।
তবে, আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ধর্মীয় কড়াকড়ি বাড়ায় রাজদরবারে হোলির জাঁকজমক হ্রাস পায়। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
মুঘলদের দোলযাত্রা তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের অনুকরণ নয়; বরং তা ছিল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও সহাবস্থানের প্রতীক। রাজশক্তি ও জনজীবনের এই মিলন ভারতীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে রঙের আবিরে রাজনীতি ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রচিত হয়েছিল।
এই দোলযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রঙের আড়ালে আসল বার্তা হল প্রেম, সাম্য ও ভক্তির ঐক্য।
এছাড়া, চৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে দোলযাত্রার কাহিনী আজ সর্বজনবিদিত। চৈতন্য মহাপ্রভুর দোলযাত্রা কেবল রঙের উৎসব নয়, এটি প্রেমভক্তির এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবাহন। ফাল্গুন পূর্ণিমায় নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য।
তাই দোলপূর্ণিমা তাঁর আবির্ভাব তিথি হিসেবেও বিশেষভাবে পালিত হয়। গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরায় এই দিনটি ‘গৌরপূর্ণিমা’ নামে পরিচিত।
চৈতন্যদেব ভক্তির মাধ্যমে মানবমনের মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর প্রচারিত ‘সংকীর্তন আন্দোলন’ ভেদাভেদ ভুলে সকলকে একত্র করেছিল কৃষ্ণপ্রেমে। দোলযাত্রার দিনে মন্দিরে মন্দিরে কীর্তনের ধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও মৃদঙ্গের তাল ভক্তদের আবেগে ভাসিয়ে তোলে। চৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তিতে আবির অর্পণ, শোভাযাত্রা ও নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এই দোলযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রঙের আড়ালে আসল বার্তা হল প্রেম, সাম্য ও ভক্তির ঐক্য। চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনদর্শন আজও সমাজকে শেখায়, হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেম জাগ্রত হলেই মানবজীবন রঙিন ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিককালে এই রঙের উৎসবকে বরণ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতিকে এক অসামান্য বসন্তোৎসব উপহার দিয়েছিলেন। গানে নাচে আবিরের রঙে রাঙিয়ে শালীনভাবে উদযাপন করতে তিনিই গত শতকে শিখিয়েছিলেন। ঋতুরাজ বসন্তকে কেন্দ্র করে কত যে গান তিনি লিখেছেন এবং পাশাপাশি বসন্ত উদযাপনের জন্য ফাল্গুনী, বসন্ত, নবীন নাটকগুলিও লিখেছেন।
সাহিত্যের আঙিনায় বসন্তকে এভাবে স্থান একমাত্র রবীন্দ্রনাথই দিতে পেরেছেন। আজ বাংলার দিকে দিকে তাঁর দেখানো পথেই বসন্তোৎসবের উদযাপন দেখা যায়। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, বসন্তের এই রঙিন উৎসবে মানবমনের জয়মাল্য গাঁথা হয়।
দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক