উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের কথা। ধর্মীয় ভেদাভেদ, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতি নানান কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার পাশাপাশি ইংরেজশক্তির দাপট ও প্রভূত্বে ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয় জীবনে চলছে এক মহাক্রান্তিকাল।
সেসময়ে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়, দুর্বিষহ। বাল্যবিবাহ, অকাল বৈধব্য, অন্তঃপুরবাসপ্রথা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদি অগণিত সমস্যায় জর্জরিত ছিল নারীসমাজ।
জাতীয় জীবনের এহেন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাংলার বুকে এক নিভৃত পল্লীতে আবির্ভাব ঘটে এমন এক মহীয়সীর যিনি গ্রাম্য পরিবেশের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেও প্রাত্যহিক জীবনচর্যার প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন এক বৈপ্লবিক চিন্তাধারার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যা সে যুগে নারীদের কাছে তো বটেই এমনকি উচ্চশিক্ষিত প্রগতিশীল পুরুষদের কাছেও চিন্তার অতীত ছিল।
তাঁর জীবন ও চরিত্রে প্রাচীন ভারতীয় জীবনাদর্শ ও আধুনিকতার এমন এক সুষম সমন্বয় ঘটেছিল যে সে সময়ের সমাজ জীবনের প্রেক্ষিতে তিনি ছিলেন ভারতীয় নারী জাগরণের জাগ্রত প্রতিমূর্তি।
১৮৬৭ সালে চৌদ্দ বছর বয়সের সময় তিনি ঠাকুরকে প্রথম দর্শন করেন কামারপুকুর গ্রামে। ওই সময় ঠাকুর তাঁকে স্নেহের সঙ্গে গ্রহণ করে ঐহিক পরমার্থিক সকল বিষয়ে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।
তিনি শ্রীমা সারদা দেবী, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সহধর্মিনী ও সাধনসঙ্গিনী, এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ‘সঙ্ঘজননী’। ভক্তদের কাছে তিনি ‘শ্রীশ্রীমা’ নামে সর্বাধিক পরিচিত।
জন্ম ১৮৫৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে। পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী। ১৮৫৯ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে দক্ষিণেশ্বরের সাধক ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণের বয়স তখন চব্বিশ। একেবারে শিশু বলে বিয়ের পরেও সারদা জয়রামবাটীতে তাঁর মা-বাবার তত্ত্বাবধানেই রইলেন। বড় হবার পর, ১৮৬৭ সালে চৌদ্দ বছর বয়সের সময় তিনি ঠাকুরকে প্রথম দর্শন করেন কামারপুকুর গ্রামে।
ওই সময় ঠাকুর তাঁকে স্নেহের সঙ্গে গ্রহণ করে ঐহিক পরমার্থিক সকল বিষয়ে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। ১৮৬৭ সালের শেষের দিকে ঠাকুর ফিরে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীমাও ঠাকুরের স্নেহযত্ন ও দিব্যসঙ্গের আনন্দের অনুভূতি নিয়ে জয়রামবাটীতে ফিরে এলেন।
এরপর দীর্ঘ চার বছর পর, ১৮৭২ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আসেন।
শ্রীমা এই সময়ে নবযৌবনসম্পন্না। সহধর্মিণী দক্ষিণেশ্বরে এলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর পায়ে পড়ে বলেছিলেন— ‘মা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক মেয়ের মধ্যেই তিনি বিরাজ করেন, আমিও শিখে নিয়েছি প্রত্যেক মেয়েকে জননী হিসেবে দেখতে। এইভাবেই আমি তোমাকে দেখতে চাই, কিন্তু তুমি যদি আমাকে টেনে আনতে চাও, আমি তোমার কথা শুনবো, কারণ আমি তোমাকে মন্ত্রসাক্ষী রেখে বিয়ে করেছি।’
স্বামীর মনোভাব বুঝতে পেরে শ্রীমা প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘জোর করে আপনাকে সংসারী করবার ইচ্ছা আমার নেই, আমি কেবল কাছে থেকে আপনার সেবা করতে চাই, আপনার কাছে সাধনভজন শিখতে চাই।’
ঠাকুরের দর্শন ও তাঁর সেবা করার সুযোগ পেয়ে শ্রীমা’র প্রাণের আকাঙ্ক্ষা মিটল।
বস্তুতঃ শ্রীমা’র দক্ষিণেশ্বরে আগমন শুধু ওইটুকু কাজের জন্য ছিল না, এর পেছনে ছিল জগন্মাতার বিশেষ অভিপ্রায়। শ্রীমা ও ঠাকুর উভয়েই ছিলেন তাঁর হাতের নিখুঁত যন্ত্র। জগৎকল্যাণে জগন্মাতার ঈপ্সিত কাজ সম্পাদনের জন্যই সংযুক্তভাবে জগতে তাঁদের আবির্ভাব।
কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণ দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন যে, তাঁর আধ্যাত্মিক প্রচারকার্য পরবর্তীকালে চালিয়ে নিয়ে যাবেন সারদা দেবী। শ্রীমা কাছে আসতেই তাই ঠাকুর অতি স্বাভাবিকভাবেই সেই কাজ আরম্ভ করে দিলেন। শ্রীমা’র সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও আত্মবিকাশের ভার নিয়ে তাঁকে ঐহিক পরমার্থিক সকল বিষয়েই শিক্ষা দিতে লাগলেন।
শ্রীমাকে ঠাকুর স্বয়ং নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর প্রয়াণের পর রামকৃষ্ণ আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং ভক্তদের বলেছিলেন ঠাকুর ও শ্রীমায়ের সত্তায় কোনো পার্থক্য আরোপ না করতে।
ঠাকুরের সান্নিধ্য ও পরিচালনায় শ্রীমা ব্যবহারিক জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনায়ও গভীর জ্ঞানলাভ করেন। জগতের প্রত্যেকের উপর ঠাকুরের যে মাতৃভাব ছিল জগতকে কৃপা করার জন্য ঠাকুর শ্রীমা’কে তাঁর নিজের অন্তরের মাতৃভাবের বিগ্রহরূপেও সযত্নে গড়ে তোলেন।
শ্রীমা’কে ঠাকুর জগন্মাতার অংশ ভাবতেন। ঠাকুর বলেছেন, ‘সারদা, সরস্বতী, জ্ঞান দিতে এসেছে।’ তিনি বলেছেন, ‘যে মা মন্দিরে আছেন, তিনিই এ শরীরের জন্ম দিয়েছেন ও এখন নহবতে বাস করছেন, আর তিনিই এখন আমার পদসেবা করছেন।’
১৮৭২ সালের (বাংলা ১২৭৯) জ্যৈষ্ঠ মাস, ফলহারিণী কালিকাপূজার দিন ঠাকুর শ্রীমা’কে ষোড়শোপচারে ষোড়শী বা দেবীজ্ঞানে পুজো করেন। শ্রীমা সেদিন জগদম্বার মতো বসন-অলঙ্কারে ভূষিতা হয়ে অধিষ্ঠান করলেন আলপনা আঁকা পিঁড়িতে। তাঁকে ‘ত্রিপুরেশ্বরী’ সম্বোধন করে ঠাকুর মন্ত্র পাঠ শুরু করলেন, করলেন পুজো।
শ্রীমা’র চরণে সমর্পণ করলেন নিজের সঙ্গে নিজের সাধনফল জপের মালাসহ সর্বস্ব। শ্রীমা’র মধ্যে জগজ্জননীকে আহবান করে ‘মা সারদা’-রূপে তাঁকে এগিয়ে দিলেন জগৎকল্যাণ সাধনের পথে।
শ্রীমাকে ঠাকুর স্বয়ং নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর প্রয়াণের পর রামকৃষ্ণ আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং ভক্তদের বলেছিলেন ঠাকুর ও শ্রীমায়ের সত্তায় কোনো পার্থক্য আরোপ না করতে।
ঠাকুরের তিরোধানের পর জগতের আর্ত-মানুষকে শান্তি, মুক্তি ও অভয় বিতরণের জন্য স্নেহ-করুণাঘন এক অপূর্ব মাতৃমূর্তিতে প্রকট হলেন সাক্ষাৎ শক্তিস্বরূপিণী জগত্তারিনী শ্রীমা সারদাদেবী। হয়ে উঠলেন সকলের মা। ঠাকুরের আরদ্ধ কাজের ভার, সকলের পরমার্থিক কল্যাণের ভার তুলে নিলেন নিজহাতে।
শ্রীরামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে অঙ্কুরিত ধর্ম আন্দোলনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
সেযুগে ছুঁতমার্গ ও রক্ষণশীলতার যে ভয়ানক গোঁড়ামি ছিল শ্রীমা তার গন্ডি অতিক্রম করে জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভক্তকেই পরম স্নেহে নিজের সন্তানের মতো গ্রহণ করেন। সকলের প্রতিই তাঁর অপার স্নেহ ও করুণা।
তিনি বলেন, ‘আমি সতেরও মা, অসতরেও মা। আমি সত্যিকারের মা; গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়, সত্য জননী।’
শত শত ভক্ত তাঁকে ‘মা’ বলে ডেকে তৃপ্ত ও পরিপূর্ণ হয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীমা'কে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেন এবং অন্যদেরও এভাবে প্রণাম করতে বলতেন। তিনি বলতেন, ‘উনি এতই কৃপাময়ী, কোমলপ্রাণা, স্নেহাতুরা যে, কেউ ওঁর পাদপদ্ম স্পর্শ করলে উনি তৎক্ষণাৎ তাঁর জ্বালা-যন্ত্রণাকে টেনে নেবেন নিজের মধ্যে। তার ফলে অপরের জন্য ওঁকে নিঃশব্দে ভুগতে হয়।’
জ্ঞান-প্রেম-করুণা-সরলতার প্রতিমূর্তি ও উন্নত আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন শ্রীমায়ের শিক্ষা ও উপদেশদানের ধরন ছিল অভূতপূর্ব। সে যুগের নিয়মানুসারে প্রথাগত বিদ্যাশিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ পাননি তিনি।
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একজন গ্রাম্য নারী প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াও যেভাবে গভীর দর্শনের কথা বলে গেছেন তা সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। অসাধারণ বাস্তববোধসম্পন্ন শ্রীমা জীবনে কোন পথে, কিভাবে চলতে হবে তাও শিখিয়ে গেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একজন গ্রাম্য নারী প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াও যেভাবে গভীর দর্শনের কথা বলে গেছেন তা সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। অসাধারণ বাস্তববোধসম্পন্ন শ্রীমা জীবনে কোন পথে, কিভাবে চলতে হবে তাও শিখিয়ে গেছেন।
শ্রীমায়ের জীবনদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে দয়া, ভালোবাসা, ক্ষমা ও ঈশ্বরে আত্মনিবেদন। তিনি বলতেন, দয়া যার শরীরে নাই, সে কি মানুষ? সে তো পশু। তিনি মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘ভালোবাসায় সবকিছু হয়, জোর করে কায়দায় ফেলে কাউকে দিয়ে কিছু করানো যায় না।’
তাঁর প্রধান শিক্ষার মধ্যে রয়েছে—পরনিন্দা না করে নিজের দোষ খোঁজা। বলেছেন “যদি শান্তি চাও, মা, কারো দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার ক'রে নিতে শেখ, কেউ পর নয়, মা; জগৎ তোমার।”
তিনি ঈশ্বরে শরণাগত হয়ে থাকার কথা বলেছেন, পদ্মপাতায় জলের মতো সংসারে থেকেও নির্লিপ্ত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
নারীজাতির সার্বিক উন্নতি ও বিকাশে শ্রীমায়ের চিন্তাধারা ছিল মুক্ত ও আধুনিক। তিনি মনে করতেন, নারীশিক্ষার বিস্তার না ঘটলে নারীজাতি নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। চাইতেন তাই মেয়েরা লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হোক। নারীশিক্ষা প্রসারে তিনি ভগিনী নিবেদিতাকে পূর্ণ সমর্থন ও আশীর্বাদ জুগিয়েছিলেন।
তাঁর সম্পর্কে স্বামীজি বলেছিলেন, ‘আমাদের মাতাঠাকুরানী বিরাট আধ্যাত্মিক শক্তির ভান্ডার, যদিও আপাতভাবে গভীর সমুদ্রের মতো শান্ত। তাঁর আবির্ভাব ভারতবর্ষের ইতিহাসে নবযুগের সূচনা করেছে।
যে আদর্শকে (তিনি) জীবনে উপলব্ধি করেছেন, যার প্রকাশ তিনি করেছেন তা কেবল ভারতীয় নারীদেরই মুক্তি দেবে না, পরন্তু সমস্ত পৃথিবীর নারীদের মন ও হৃদয়ে প্রবেশ করে তাদের প্রভাবিত করবে।’
সত্যস্বরূপিনী, কল্যাণময়ী, জগদানন্দদায়িনী শ্রীমা সারদা দেবী মানবজাতির চিরন্তন আদর্শের পরাকাষ্ঠা হয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ১৯২০ সালের ২০ জুলাই রাত ১টা ৩০ মিনিটে কলকাতার উদ্বোধন ভবনে তাঁর মহাসমাধি (তিরোধান) ঘটে।
দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক