মনসাপূজা: ভয়কে জয় করার আরাধনা

ছবি: উইকিপিডিয়া

গুহামানবের জীবন থেকে বেরিয়ে এসে যখন সমাজের রূপদান করতে শুরু করে মনুষ্যজাতি, প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের প্রাণীদেরও ভয় পেতে থাকে, যাদের কারণে মনুষ্যজাতির নানান ক্ষয়ক্ষতি হতো।

সমাজবদ্ধ প্রাণী হিসেবে মানুষ সেই ভয়কে জয় করার লক্ষ্যে একেকটি পূজা বা উপাসনার আয়োজন করা শুরু করে।

বর্ষাকালে যখন অবিরাম বৃষ্টিতে চাষাবাদের জমিজুড়ে জলের প্লাবন দেখা যায়, মাঠের জীবজন্তুরাও তখন প্রাণের আশায় বানভাসি হয়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে মানবসমাজের মধ্যে। বিষধর সর্পকুল তখন আশ্রয় নেয় গৃহবাসীর অন্দরমহলে।

বিষধর সাপের আকস্মিক ছোবলে মৃত্যুর আশঙ্কা বড় ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে মানুষের মধ্যে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ সাপের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচার আশায় তাদের পূজা করার আয়োজন করে। এমন এক আয়োজন থেকেই সৃষ্টি হয়েছে শ্রাবণ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে মনসাপূজা।

জানা যায়, যজুর্বেদ ও বিশেষত অথর্ববেদে সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মন্ত্রপাঠের বিধি আছে। পরবর্তী সময় ‘গৃহ্যসূত্রে’ও সাপকে সম্মান জানানোর জন্য বার্ষিক আচার-অনুষ্ঠান পালনের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, মনসাদেবীর বর্তমান রূপে পূজা দশম-একাদশ শতকে শুরু হয়।

এই পূজা মূলত গ্রামীণ জীবনে সাপের ভয় থেকে বাঁচতে এবং উর্বরতা শক্তি ও সমৃদ্ধি লাভের জন্য প্রচলিত ছিল। ভরা বর্ষামৌসুমে বাংলার এই নদীমাতৃক চরাচরে সর্পভীতি ও এর থেকে মুক্তির এক আদিম সংস্কার থেকেই মনসাপূজার প্রবর্তন। তবে পুরাণে বিধৃত নানা কাহিনি থেকে বোঝা যায়, মনসা লৌকিক দেবী।

‘নাগ’ শব্দের ব্যঞ্জনায় দেখা যায় একদিকে তার অর্থ সাপ, আবার আর্য-বৈদিক সংস্কৃতির বিরোধী আদিবাসীদেরও নাগ বলা হয়। আর্যরা এদের উভচর বলে মনে করত।
আরও পড়ুন

মনসাপূজার সঙ্গে আছে মনসাগাছ পূজা বা বৃক্ষোপাসনার সংযোগ। এর পেছনে আছে পৌরাণিক কাহিনিও। শিবের দ্বারা বিল্ববৃক্ষ–আশ্লিষ্ট হওয়ার পরিণতিতে মনসার জন্ম নেওয়ার কাহিনি এই বৃক্ষোপাসনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

আজও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তাই মনসাপূজার বদলে ‘গাছপূজা’ কথাটি ব্যবহৃত হয়। মনসা শিবকন্যা রূপেই জনমানসে পরিচিত হন।

মনসার জন্ম নিয়ে একাধিক কাহিনি প্রচলিত। আরেকটি কাহিনি হলো, শিবের চরিত্র পরীক্ষা করার জন্য দেবী দুর্গা আদিবাসী কন্যার রূপ ধারণ করে তাঁকে প্রলুব্ধ করে অরণ্যে নিয়ে যান এবং তারই পরিণামে আদিবাসীর দৌহিত্রী রূপে মনসার জন্ম।

এখানে তিনি উচ্চবর্ণের দুহিতা বা দৌহিত্রী নন; বরং অন্ত্যজ ও অবহেলিত সমাজের ঘরের মেয়ে রূপে আবির্ভূতা। এটি নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক সূচক। ‘নাগ’ শব্দের ব্যঞ্জনায় দেখা যায় একদিকে তার অর্থ সাপ, আবার আর্য-বৈদিক সংস্কৃতির বিরোধী আদিবাসীদেরও নাগ বলা হয়। আর্যরা এদের উভচর বলে মনে করত।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জহর সরকার বলেছেন, যমুনার পূর্ববর্তী ভূখণ্ডের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বৈদিক এবং উত্তর-বৈদিক সভ্যতার অনেকটা সময় লেগেছিল এবং গাঙ্গেয় অববাহিকার জলজঙ্গলে নানান বন্য প্রাণীর সঙ্গে সাপখোপের প্রাচুর্য তার একটা কারণ।

তাঁর মতে, বৈদিক বিষ্ণুর মূর্তিকল্পনায় দেখা গিয়েছিল যে তিনি বিপুল শেষনাগের কোলে অনন্ত শয়নে শায়িত, আবার সেই মহাসর্পই ফণা তুলে তাঁর মাথায় ছাতা ধরে আছে। শিবের কণ্ঠেও বাসুকিকে দেখা যায়।

আরও পড়ুন
বাড়ির উঠানে মনসার থানের আলপনার ওপর বাস্তুসাপ যদি ঘুরেফিরে যায়, তবে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পূর্বপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। এই বিশ্বাস একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রবণতা।

অর্থাৎ যেসব নাগ একদিন ভয়ংকর ছিল, তারাই কীভাবে ক্রমশ বৈদিক (বিষ্ণু) এবং অবৈদিক (শিব) দেবতাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। পরস্পরের বিরোধী বিশ্বাসকে মিলিয়ে দেওয়ার এই আশ্চর্য ক্ষমতা ভারতীয় সভ্যতার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

বাংলার গ্রামগঞ্জে শিব ও চণ্ডীর কোনো না কোনো রূপকে অবলম্বন করে থান বা মন্দির স্থাপিত হয়েছে। মনসার নামেও এমনটি রয়েছে। নানা নামে, নানা মূর্তিতে; যেমন সর্পমূর্তি, মনসামূর্তি, হংসবাহিনী মূর্তি, অষ্টনাগে তিনি পূজিত হন। দুধ, কলা, সন্দেশ, ফুল ও চাল দিয়ে মনসাপূজা করা হয়।

পাশাপাশি হাঁস, মুরগি কিংবা ছাগল বলি দিয়েও পূজা করার প্রচলন রয়েছে। বাড়ির উঠানে মনসার থানের আলপনার ওপর বাস্তুসাপ যদি ঘুরেফিরে যায়, তবে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পূর্বপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। এই বিশ্বাস একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রবণতা।

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য ‘মনসামঙ্গল’-এ দেবী মনসার মাহাত্ম্য প্রচার ও পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শিবভক্ত চাঁদ সদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকার করায় মনসা তার পুত্র লখিন্দরকে সাপের কামড়ে মেরে ফেলেন।

চাঁদ সদাগরের পুত্রবধূ বেহুলা তখন স্বামীর জীবন ফিরে পেতে মনসার পূজা করেন এবং অবশেষে চাঁদ সদাগরও মনসার পূজা করতে বাধ্য হন। এই কাব্যের নায়িকা বেহুলাও সাহা নামের এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

আর সেই কারণে বণিক পরিবারে মনসাপূজার তোড়জোড় খুবই ধুমধামভাবেই হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে উচ্চশ্রেণির সমাজের কাছে মনসাপূজা প্রচার লাভ করে।

বাংলার গ্রামে গ্রামে শ্রাবণ মাসজুড়ে মনসাপূজা করা হয়। এই উপলক্ষে পালাগান ‘সয়লা’ চলে। এই পালার বিষয়—পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গল। সারা রাত গায়ক পালা আকারে ‘সয়লা’ গান গেয়ে থাকেন।

  • দীপান্বিতা দে: প্রাবন্ধিক ও শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন