চড়ক গাজন: বাংলার একটি গ্রামীণ উৎসব

একটি গ্রামীণ গাজন উৎসবের দৃশ্যছবি: উইকিপিডিয়া

ছেলেবেলায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ পড়ার সময় প্রথম জেনেছিলাম চড়ক আর গাজনের কথা। কারণ, বাংলার সব অঞ্চলেই যে চড়ক বা গাজনের উৎসব বা মেলা বসে, তা তো নয়।

সেখানে ছিল, ‘চড়কের আর বেশি দেরি নাই। বাড়ি বাড়ি গাজনের সন্ন‍্যাসীরা নাচিতে বাহির হইয়াছে। দুর্গা ও অপু আহার নিদ্রা ত‍্যাগ করিয়া সন্ন‍্যাসীদের পিছনে পিছনে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়া বেড়াইল।’

তখন থেকেই কৌতূহল জন্মেছিল এই গ্রামীণ উৎসব সম্পর্কে জানার।

বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ মাসটির নাম ‘চৈত্র’। বাংলার চারদিকে তখন প্রখর তাপদাহ চলতে থাকে। এই চৈত্র মাসের শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাঙ্গ হয় ঋতুরাজ বসন্তের। এরপর শুরু হয় নতুন বছর।

নতুন বছরে পদার্পণের পূর্বমুহূর্তে, অর্থাৎ পুরোনো বছরের শেষে সনাতনী হিন্দুরা বিশেষ করে গ্রামবাংলায় উদ্‌যাপন করেন একটি জনপ্রিয় লোক-উৎসব চড়ক, যাকে গাজন উৎসবও বলা হয়। উৎসবটি এককালে গ্রামাঞ্চলের ধর্মভীরু সনাতনীদের বলতে গেলে নিজস্ব উৎসব ছিল।

ধীরে ধীরে সভ‍্যতার করাল গ্রাসে গ্রামবাংলার সেই মেঠো জীবনের অনেক পরিবর্তন ঘটে যাওয়ায় গাজন ক্রমে বিলুপ্তির পথে। তবু দুই বাংলার বহু গ্রামে এবং শহরাঞ্চলের কিছু কিছু অংশে গাজন উৎসব উদ্‌যাপনের রীতি আজও একুশ শতকে চোখে পড়ে। খবরের কাগজের জেলার সংবাদে স্থান পায় সেই খবর।

সংস্কৃত শব্দ ‘গর্জন’ থেকে প্রাকৃত শব্দ ‘গজ্জন’ এসেছে। তারপর তা বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে ‘গাজন’-এ।
আরও পড়ুন

‘গাজন’ শব্দটি সম্পর্কে বঙ্গীয় সাহিত‍্য পরিষদ পত্রিকায় ১৩১৮ সনে হরিদাস পালিত লিখেছিলেন, ‘জনগণের চিৎকার, বিপুল বাদ‍্যোদমে গর্জন, তাই বোধহয় উৎসব কালক্রমে গাজন নামে অভিহিত হইয়া থাকিবে।’ সংস্কৃত শব্দ ‘গর্জন’ থেকে প্রাকৃত শব্দ ‘গজ্জন’ এসেছে। তারপর তা বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে ‘গাজন’-এ। 

অনেক নৃতাত্ত্বিকের মত আবার ভিন্ন। গ্রামকে অনেকেই গাঁ বলেন, আর সেখানকার জন অর্থাৎ জনসাধারণের উপস্থিতি উপলক্ষে উদ্‌যাপিত উৎসব থেকে ‘গাজন’ শব্দের বুৎপত্তি। লোকসংস্কৃতির গবেষক তারাপদ সাঁতরার মতে, ‘গাজন’ হচ্ছে বাংলার প্রকৃত গণ–উৎসব।

সনাতন ধর্মের মানুষেরা বিশ্বাস করেন, শিবের জন্ম শ্রাবণ মাসে আর চৈত্র মাসে শিব-পার্বতীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। এটি মধুমাস। তাই ঢাকের বাজনাসহকারে ভোলানাথের নামসংকীর্তন ও গর্জন করতে করতে শিবের অনুচর সন্ন‍্যাসীরা পথ–ঘাট–মাঠ–শ্মশান প্রদক্ষিণ করেন। তখন এই তপ্তদিনের মৌন প্রান্তর মুখর হয়ে ওঠে গাজনগীতিতে এবং ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে’ উচ্চারণে।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই গাজন উৎসবে সমাজের সর্বশ্রেণির সনাতনীদের মেতে উঠতে দেখা যায় না। গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, কুমোর, কামার, জেলে, মালো, হাঁড়ি, মুচি, বাউরি, বাগদি প্রভৃতি কৌম সমাজের প্রতিনিধিরাই ভোলানাথ মহেশ্বরের স্মরণে এই উৎসব উদ্‌যাপন করেন।

তবে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায় খানিক ভিন্ন তথ‍্য। কিংবদন্তি আছে, ১৪৮৫ সালে রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুর চড়কপূজার প্রচলন করেন। তবে এই পূজা ধনীদের পূজা নয়। এমনকি ব্রাহ্মণদেরও প্রয়োজন পড়ে না এই পূজার উপাচারে।

১৮৩১ সালের ৩০ এপ্রিল সমাচার দর্পণ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ বলছে, তখনকার কলকাতার ধনী সম্প্রদায়ের বাবুরা নিজেদের বনেদিয়ানা আর আভিজাত্যের বড়াই করার জন্য একেকটি চড়কের দল অর্থ দিয়ে পুষতেন।

আরও পড়ুন
গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, কুমোর, কামার, জেলে, মালো, হাঁড়ি, মুচি, বাউরি, বাগদি প্রভৃতি কৌম সমাজের প্রতিনিধিরাই ভোলানাথ মহেশ্বরের স্মরণে এই উৎসব উদ্‌যাপন করেন।

চড়ক বলতে জানা যায়, একটি চড়কগাছকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। সেখানে গাছের গোড়ায় জলভরা পাত্রে রাখা হয় শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ, যা কিনা বুড়োশিব নামে পরিচিত। এরপর চড়কগাছের সঙ্গে চারটি চারমুখী মাচান বেঁধে তার মধ‍্যিখানে একজন করে ভক্তকে মহাদেব সাজিয়ে চার কোণে চারজন করে মোট ষোলোজনের পিঠ ফুঁড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

যদিও এই ‘ষোলো চরকি’র চড়ক শেষ পর্যন্ত ১৮৫৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৬৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার আইন করে এই উপাচারগুলো বন্ধ করার আদেশ দেয়।

দেশীয় পণ্ডিত হুতোম প‍্যাঁচাসহ প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, অমূল‍্যচরণ বিদ‍্যাভূষণ, রামকমল সেন, শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় যেমন গাজন চড়কের কথা লিখে গেছেন, পাশাপাশি ফ‍্যানি পার্কস, এলিজা ফ্রে, জিওফ্রে ওডি, ও’ম‍্যালির মতো ইংরেজ পণ্ডিতেরাও নানা কথা লিখেছেন এই উৎসব নিয়ে।

চড়কগাছে পিঠফোঁড়ানো ভক্তরা যে দণ্ডের ওপর ঘুরতে থাকেন, তাকে বলা হয় ‘গজারি’। গজারি শিবের অপর একটি নাম। চড়ক কথাটি এসেছে চক্র থেকে। অর্থাৎ চক্রাকারে ঘোরার রীতি থেকে বলা হয় ‘চড়ক’।

চড়ক ও গাজনকে কেন্দ্র করে শিবের উপাসকেরা নানা রকমের লোকাচার পালনে শামিল হন এই দিন। যেমন পিঠফোঁড়, বাণফোঁড়, চাটুফোঁড়, বঁটিঝাঁপ, কাঁটাঝাঁপ, নীলব্রত, আগুনে হাঁটা, সংনাচ প্রভৃতি।

এই দিন নারীরা তাঁদের সন্তানের মঙ্গল কামনা করে নীলব্রত পালন করেন, যেহেতু নীলকণ্ঠ মহাদেবের আরেক নাম। কোথাও কোথাও শিবের অপর নাম ‘গম্ভীর’ থেকে গম্ভীরা গানের মাধ‍্যমে শিবের সংকীর্তন করেন ভক্তরা।

দীপান্বিতা দে : প্রাবন্ধিক ও শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন