রমজানে গর্ভবতী নারীর ইবাদত

ছবি: পেক্সেলস

গর্ভাবস্থায় একজন নারী নিজের শরীরের ভেতরে আরেকটি প্রাণ বহন করেন। গর্ভে সন্তান আসা নারীর জন্য কেবল শারীরিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ সম্মান ও সৌভাগ্য।

এ সময়ে শারীরিক দুর্বলতা, বমি, ক্লান্তি ও অনিদ্রার মতো অসংখ্য কষ্ট একজন মা মুখ বুজে সহ্য করেন। নিজের শরীর, রক্ত, ঘুম ও স্বাচ্ছন্দ্য বিলিয়ে দিয়ে তিনি একটি নতুন জীবন লালন করেন। গর্ভকালীন এই ত্যাগকে ইসলাম বিন্দুমাত্র অবহেলা করে না; বরং আল্লাহ–তাআলা বান্দার নিয়ত ও ধৈর্য অনুযায়ী তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন।

গর্ভাবস্থায় দৈনন্দিন রুটিন এলোমেলো হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইবাদতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে রমজান এলে অনেক গর্ভবতী বোনের মনে প্রশ্ন জাগে—আমি কি রোজা রাখতে পারব? না রাখলে কি গুনাহ হবে? আমার ইবাদত কি কমে যাবে? ইসলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে।

১. রোজা রাখা ও না রাখার বিধান

গর্ভবতী নারী যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন। তবে যদি রোজা রাখার কারণে নিজের বা অনাগত সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তিনি রোজা না রাখার অনুমতি পাবেন। এই রোজাগুলো পরে কাজা আদায় করে নিতে হবে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে, তবে সে অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং কঠিন কিছু চান না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

ফিকহবিদরা গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীকে এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই রোজা রাখতে না পারলে কোনো অপরাধবোধে ভোগার কারণ নেই; বরং আমানত হিসেবে নিজের ও সন্তানের জীবন রক্ষা করাও ইবাদতের অংশ।

আরও পড়ুন

২. গর্ভস্থ সন্তানের ওপর কোরআনের প্রভাব

গর্ভের শিশু মায়ের সঙ্গে মানসিকভাবে গভীরভাবে যুক্ত থাকে। মায়ের আবেগ, কণ্ঠস্বর ও পরিবেশ শিশু অনুভব করতে পারে।

মানবদেহে সাধারণত ১২০ দিন বয়সে রুহ বা প্রাণ ফুঁকে দেওয়া হয়। তাই এ সময়ে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করা বা শোনা এবং জিকির করা কেবল মায়ের অন্তরকেই শান্ত করে না, সন্তানের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় তেলাওয়াত করা সম্ভব না হলে পরিচিত ছোট সুরাগুলো একটু আওয়াজ করে পড়ুন এবং তেলাওয়াত শোনার চেষ্টা করুন। এটি ঘরে রহমতের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

৩. নামাজে সহজতা ও অসুস্থ ব্যক্তির বিধান

গর্ভাবস্থায় কষ্ট হলেও নামাজ মাফ হয় না। তবে শরীর ভারী হয়ে যাওয়ায় অনেকের স্বাভাবিকভাবে নামাজ পড়তে কষ্ট হয়। ইসলাম এই দুর্বল অবস্থাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তুমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো; যদি তা সম্ভব না হয়, তবে বসে পড়ো; আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে শুয়ে নামাজ আদায় করবে।“ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১১৭)

সেজদা দিতে কষ্ট হলে সাধ্যমতো ঝুঁকে ইশারায় সেজদা দেওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, ইশারায় নামাজের ক্ষেত্রে রুকুর তুলনায় সেজদার সময় একটু বেশি ঝুঁকতে হয়।

৪. কষ্টের মুহূর্তে সওয়াবের আশা

গর্ভাবস্থার শারীরিক অস্বস্তি ও মানসিক সংবেদনশীলতাকে আল্লাহ তায়ালা গুরুত্ব দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে...“ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৪)

এই কষ্টগুলো সবরের সঙ্গে সহ্য করলে তা গুনাহ মাফের মাধ্যম হয়। যদি নিয়ত থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একজন নেক সন্তানকে পৃথিবীতে আনা, তবে প্রতিটি মুহূর্তের কষ্টই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

৫. ইসলামে মায়ের আকাশচুম্বী মর্যাদা

সন্তান ধারণ ও প্রসবের তীব্র কষ্টের কারণেই ইসলামে মায়ের মর্যাদা সবার ওপরে দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?“ রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন, “তোমার মা“, চতুর্থবার বললেন, “তোমার বাবা।“ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৪৮)

আরও পড়ুন

৬. অপরাধবোধ নয়, ভরসা রাখুন আল্লাহর ওপর

অনেকে মন খারাপ করেন যে আগের মতো তাহাজ্জুদ বা তারাবি পড়তে পারছেন না। কিন্তু আল্লাহ বান্দার সামর্থ্য জানেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না।“ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যা করতে সক্ষম, তা-ই করো।“ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮৮)

৭. এই সময়ের কিছু সহজ আমল

শুয়ে বা বসে থেকে খুব সহজেই এই জিকিরগুলো করা যায়:

  • জিকির: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

  • ইস্তিগফার: আসতাগফিরুল্লাহ বা ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি‘। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)

  • দরুদ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ।

  • সব কাজ ‘বিসমিল্লাহ‘ বলে শুরু করা এবং আজানের উত্তর দেওয়া।

৮. নিজের ও অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া

দোয়া ইবাদতের মগজ। রমজানের ইফতারের আগের সময়, তাহাজ্জুদের সময় বা শেষ দশকের রাতগুলোতে নিজের ও সন্তানের জন্য দোয়া করুন। কোরআনে শেখানো কিছু দোয়া হলো:

  • “হে আমাদের রব, আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।“ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)

  • “হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।“ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)

শেষ কথা

হে গর্ভবতী বোন, আপনি কেবল একটি সন্তান ধারণ করছেন না, বরং একটি ভবিষ্যৎ উম্মাহ লালন করছেন। আপনার ধৈর্য, প্রতিটি নড়াচড়া ও প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আল্লাহর কাছে সওয়াবের কারণ হতে পারে।

নিজেকে ছোট ভাববেন না। আপনি ঘরে বসেই আপনার রবের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত বান্দা হয়ে থাকতে পারেন। আল্লাহ সকল গর্ভবতী বোনের এই মহৎ সফরকে সহজ ও নিরাপদ করুন। আমিন।

[email protected]

ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক

আরও পড়ুন