প্রার্থনার ক্ষেত্রে ইসলাম নির্দিষ্ট কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অমুসলিমদের জন্য দোয়া করার বিষয়টি নিরঙ্কুশভাবে নিষিদ্ধ নয়, আবার ঢালাওভাবে বৈধও নয়।
ব্যক্তি জীবিত না মৃত এবং তার জন্য দুনিয়া না আখেরাতের কল্যাণ চাওয়া হচ্ছে—এই পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে শরিয়তের বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়।
জীবিত অমুসলিমদের জন্য দোয়া
অমুসলিম ব্যক্তি যদি জীবিত থাকেন, তবে তার জন্য দোয়া করার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে তার হেদায়েত বা সুপথ প্রাপ্তির জন্য দোয়া করা কেবল বৈধই নয়, বরং এটি নবীজির সুন্নাহ।
মক্কি জীবনের কঠিন সময়ে মহানবী (সা.) আবু জাহেল ও ওমর ইবনুল খাত্তাবের নাম উল্লেখ করে দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে আপনার কাছে যে অধিক প্রিয়, তার মাধ্যমে আপনি ইসলামকে শক্তিশালী করুন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৮১)
এই দোয়ার বদৌলতে পরবর্তী সময়ে ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
এ ছাড়া জীবিত অমুসলিমের দুনিয়াবি কল্যাণ, সুস্থতা বা বিপদ মুক্তির জন্যও দোয়া করা যায়। ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজি (সা.) কাফেরদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমার কওমকে ক্ষমা করুন (হেদায়েত দিন), কারণ তারা জানে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৭৭)
আজহার ফতোয়া কমিটির সাবেক প্রধান শায়খ আতিয়া সাকার বলেন, জীবিত অবস্থায় তাদের জন্য রহমত ও হেদায়েতের দোয়া করা যায়, কারণ তাদের ইমান আনার সম্ভাবনা তখনো শেষ হয়ে যায় না। (ফাতাওয়া আল-আজহার, ১০/১২৮, মাজমাউল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ, কায়রো)
মৃত অমুসলিমদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা
অমুসলিম অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে যার, তার পরকালীন মুক্তির জন্য দোয়া করার সুযোগ ইসলামে নেই। কোরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, “নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়; যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামী।” (সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আগে কিছু মুসলমান তাদের মৃত অমুসলিম আত্মীয়দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর তারা তা থেকে বিরত হন। তবে জীবিতদের জন্য দোয়া করার বিষয়টি এতে নিষিদ্ধ করা হয়নি। (ইমাম তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৪/৫০৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০১)
এমনকি নবীজি (সা.) তাঁর মায়ের কবর জেয়ারত করার সময় তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ সেই অনুমতি দেননি। তবে তাকে কেবল কবর জেয়ারত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৭৬)
মক্কায় অবস্থানকালে নবীজি (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিবের মৃত্যুশয্যায় তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তখন রাসুল (সা.) বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব যতক্ষণ না আমাকে নিষেধ করা হয়।”
এরপরই সুরা তাওবার ১১৩ ও ১১৪ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। (ইমাম কুরতুবি, তাফসিরুল কুরতুবি, ৮/২৭৩, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০৬)
কেন এই সীমাবদ্ধতা
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, পরকালীন মুক্তি বা ক্ষমা কেবল ইমানের ওপর নির্ভরশীল। এটি আল্লাহর একটি চূড়ান্ত ফয়সালা। কেউ যদি স্বেচ্ছায় ইমানকে প্রত্যাখ্যান করে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার শামিল।
তবে তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা শোক প্রকাশে কোনো বাধা নেই।
সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর দামিজির মতে, দোয়া বা ইবাদতের এই সীমারেখাটি কেবল বিশ্বাসের। অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ, সামাজিক সুসম্পর্ক এবং তাদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো ইসলামের মৌলিক নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু দোয়া যখন পরকাল ও ক্ষমার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা কেবল ইমানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। (আল-ওয়াহ্ই ইলা ইবতিদালিল মাসাইল, ১/৪২, দারুত তাদমিরিয়্যাহ, রিয়াদ: ২০০৯)