২৬ রমজান ইতিহাসের এক ‘সন্ধিক্ষণ’। এই দিনে নবীজির (সা.) নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘ ও কঠিনতম এক অভিযানের সফল সমাপ্তি ঘটে, অন্যদিকে মিসরে আগমন ঘটে এক মহীয়সী নারী জ্ঞানীর, যাঁর প্রভাবে এই অঞ্চলটি ইলমি ও আধ্যাত্মিক চর্চায় ধন্য হয়।
আবার এই দিনেই মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কায়রো থেকে ইস্তাম্বুলে স্থানান্তরিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন
৯ হিজরির ২৬ রমজান (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ) আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জীবনের দীর্ঘতম সামরিক অভিযান ‘তাবুক’ শেষ করে মদিনায় ফিরে আসেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৪/৫২০, ১৯৫৫)
এই অভিযানটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শক্তির মহড়া। এই ফেরার পথে সাহাবিদের আনুগত্য ও ইমানের এক কঠোর পরীক্ষা হয়েছিল।
এই দিনেই অবতীর্ণ হয়েছিল তিন সাহাবির তওবা কবুলের সুসংবাদ, যারা যুদ্ধে অংশ নিতে না পেরে লজ্জিত ও অনুতপ্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাব ইবনে মালিক (রা.)।
এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে আরবের মোনাফেকদের ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ হয় এবং রোমানদের মনে মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব গেঁথে যায়।
মিসরে সৈয়দা নাফিসার আগমন
১৯৩ হিজরির ২৬ রমজান (৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই দিনে নবীজির (সা.) বংশধর এবং তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ নারী ফকিহ ও আবিদা সৈয়দা নাফিসা বিনতে হাসান ইবনে জায়েদ মিসরে আগমন করেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১০/১৮০, ১৯৮৫)
তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার। ইমাম শাফেয়ি (র.) যখন মিসরে আসতেন, তিনি সৈয়দা নাফিসার মজলিসে বসে হাদিস শুনতেন এবং অনেক বিষয়ে তাঁর ফতোয়া নিতেন।
কথিত আছে, ইমাম শাফেয়ি অসিয়ত করেছিলেন যেন তাঁর জানাজা সৈয়দা নাফিসার বাড়ির সামনে পড়া হয়। তাঁর আগমনের ফলে মিসরের জ্ঞানচর্চায় নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
খেলাফতের ভরকেন্দ্র পরিবর্তন
৯২৩ হিজরির (১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দ) রমজানের শেষ দিকে মিসরে মামলুক শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং অটোমান আধিপত্য সুসংহত হয়।
রাইদানিয়ার যুদ্ধের পর সুলতান সেলিম যখন মিসরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মিসরে অবস্থানরত শেষ আব্বাসীয় খলিফা তৃতীয় মুতাওয়াক্কিল অটোমানদের কাছে খেলাফতের প্রতীক ও আমানতসমূহ হস্তান্তর করেন।
এর ফলে খেলাফতের কেন্দ্রবিন্দু কায়রো থেকে ইস্তাম্বুলে স্থানান্তরিত হয় এবং সুলতান সেলিম ‘খাদিমুল হারামাইন শরিফাইন’ বা পবিত্র দুই হারামের খাদেম উপাধি গ্রহণ করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/৩৭০, ১৯৮৮)
বদরুদ্দিন আইনির জন্ম
৭৬২ হিজরির ২৬ রমজান (১৩৬১ খ্রিষ্টাব্দ) আইন্তাব শহরে জন্মগ্রহণ করেন মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইমাম বদরুদ্দিন আইনি। তিনি ছিলেন হানাফি মাজহাবের একজন স্তম্ভ।
সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল কারি রচনার মাধ্যমে তিনি অমর হয়ে আছেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২৫/৪২০, ১৯৮৫
ইবনে হাজার আসকালানির ফাতহুল বারির প্রতিযোগী তাঁর এই গ্রন্থটি আজও আলেম সমাজের কাছে এক আকর গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত।
জাঞ্জ বিদ্রোহ ও সামাজিক বিপ্লব
২৫৫ হিজরির ২৬ রমজান ইরাকের বসরায় ‘জাঞ্জ বিদ্রোহ’ শুরু হয়। এটি ছিল তৎকালীন আব্বাসীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিদ্রোহ।
প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা এই বিদ্রোহ তৎকালীন যুগের বৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক চরম প্রতিবাদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে আছে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৬/১৯০, ১৯৮৭)