পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের ৩ রূপরেখা

ছবি: এআই / প্রথম আলো

আধুনিক বিশ্ব যখন ‘টেকসই উন্নয়ন’ নিয়ে নানা আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়নে ব্যস্ত, তখন ইসলামের মৌলিক দর্শনের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে এক বিস্ময়কর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্কের পাশাপাশি চারপাশের মাটি, জল, অরণ্য ও পশুপাখির সঙ্গে মানুষের ব্যবহার কেমন হবে—তারও স্পষ্ট সীমারেখা এখানে টানা হয়েছে।

প্রকৃতির ওপর মানুষের কর্তৃত্বকে ইসলাম কখনোই অবাধ ছাড়পত্র দেয়নি; বরং প্রকৃতিকে বিবেচনা করেছে একটি পবিত্র ‘আমানত’ বা দায়িত্ব হিসেবে।

সুরক্ষার তিন স্তম্ভ

ইসলামি জীবনদর্শনে পরিবেশভাবনার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি শব্দের ওপর—সংরক্ষণ, সমৃদ্ধি এবং স্থায়িত্ব।

প্রকৃতির যে অমূল্য নেয়ামতগুলো মানুষের হাতের নাগালে রয়েছে, সেগুলোর অপচয় রোধ করা এবং সেগুলোকে বিনষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখাই হলো সংরক্ষণ।

অন্যদিকে উৎপাদনশীল শ্রম ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদকে বৃদ্ধি করা হলো সমৃদ্ধি। আর এই সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির ধারা যেন সাময়িক আবেগে আটকে না থেকে যুগ যুগ ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করাই হলো স্থায়িত্ব।

উৎপাদনশীল শ্রম ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদকে বৃদ্ধি করা হলো সমৃদ্ধি। আর এই সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির ধারা যেন সাময়িক আবেগে আটকে না থেকে যুগ যুগ ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করাই হলো স্থায়িত্ব।

পবিত্র কোরআনে নগরায়ন ও উন্নয়নের পথ দেখিয়েও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে, “স্মরণ করো, আদ জাতির পর আল্লাহ তোমাদের তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং জমিনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন; তোমরা সমতল ভূমিতে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নেয়ামতসমূহ স্মরণ করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৭৪)

অর্থাৎ প্রযুক্তি ও নির্মাণের স্বাধীনতা মানুষের থাকবে, কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য চূর্ণ করে কোনো উন্নয়ন ইসলাম অনুমোদন করে না।

আরও পড়ুন

প্রকৃতির পরিচর্যায় ইতিবাচক পদক্ষেপ

ইসলামি আইন ও দর্শনের প্রধান উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদে শরিয়াহ’র আলোকে পরিবেশ সুরক্ষাকে দুটি মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়—একদিকে ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রকৃতির বিকাশ ঘটানো, অন্যদিকে কোনো মন্দ শক্তির দ্বারা যেন প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা কঠোরভাবে ঠেকানো।

এই তাত্ত্বিক কাঠামোর রূপরেখা টানতে গিয়ে ইমাম আবু ইসহাক আশ-শাতিবি লিখেছিলেন, “শরিয়তের মৌলিক ভিত্তিসমূহ রক্ষা করার দুটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো, যা এর মূল স্তম্ভগুলো প্রতিষ্ঠিত করে এবং বিকাশকে সুদৃঢ় রাখে—এটি অস্তিত্বের দিক থেকে সংরক্ষণ। দ্বিতীয়টি হলো, যা এর ওপর আসা বর্তমান কিংবা সম্ভাব্য সকল ক্ষতি ও সংকটকে দূর করে—এটি বিনাশ রোধের দিক থেকে সংরক্ষণ।” (আশ-শাতিবি, আল-মুওয়াফাকাত, ২/৮–১০, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৭৫)

অস্তিত্বের দিক থেকে মহান আল্লাহ নিখিল বিশ্বকে এক নিখুঁত গাণিতিক ভারসাম্যে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তিনি সেই সত্তা, যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সর্বোত্তম রূপে তৈরি করেছেন।” (সুরা সাজদাহ, আয়াত: ৭)

প্রকৃতিকে সজীব রাখার পাশাপাশি তার ক্ষতির পথগুলো বন্ধ করাও ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাগরিক জীবনে সামান্য বিশৃঙ্খলা যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে, সেদিকে ইসলাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে।

প্রকৃতির এই নিখুঁত নকশা ব্যাখ্যা করে অন্যত্র বলা হয়েছে, “আমি জমিনকে বিস্তৃত করেছি, তাতে স্থাপন করেছি অবিচল পর্বতমালা এবং সেখানে উৎপন্ন করেছি পরিমিত সবকিছু। আমি তোমাদের জন্য তাতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি এবং তাদের জন্যও—যাদের রিজিকদাতা তোমরা নও।” (সুরা হিজর, আয়াত: ১৯–২০)

সৃষ্টিজগতের এই সৌন্দর্য বজায় রাখতে রাসুল (সা.) সবুজায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। গাছ লাগানোকে তিনি চিহ্নিত করেছেন অন্তহীন নেক আমল বা সদকা হিসেবে।

তিনি বলেছেন, “কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)

সবুজায়নের এই ধারাবাহিকতা কতটা অনমনীয়, তা ফুটে ওঠে রাসুল (সা.) এক ঐতিহাসিক নির্দেশনায়। তিনি বলেছেন, “যদি কেয়ামত উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করার সুযোগ পেলে অবশ্যই রোপণ করে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)

মহাপ্রলয়ের মুহূর্তেও একটি চারা রোপণ করে যাওয়ার তাগিদ পৃথিবীর আর কোনো দর্শনে খুঁজে পাওয়া বিরল।

একইভাবে অনাবাদি ও পতিত জমিকে ফেলে না রেখে উর্বর করার সামাজিক প্রণোদনা দিয়েছে ইসলাম। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কোনো পতিত জমি আবাদ করল যা কারও মালিকানাধীন নয়, সে-ই তার সর্বাধিক হকদার।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৩৫)

অন্যদিকে একসময় যে মরুময় আরবও সবুজে ছেয়ে যাবে, সেই পরিবেশগত রূপান্তরের পূর্বাভাস দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না আরব ভূখণ্ড পুনরায় সবুজ চারণভূমি ও নদ-নদীতে পরিণত হয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭)

দূষণ, অস্বাস্থ্য ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কঠোরতা

প্রকৃতিকে সজীব রাখার পাশাপাশি তার ক্ষতির পথগুলো বন্ধ করাও ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাগরিক জীবনে সামান্য বিশৃঙ্খলা যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে, সেদিকে ইসলাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে।

পরিবেশ পরিষ্কার রাখাকে রাসুল (সা.) ইমানের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বানিয়েছেন, “ইমানের সত্তরেরও অধিক শাখা রয়েছে; এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা আর সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

আরও পড়ুন

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে তিনি নিত্যদিনের ব্যবহার্য জিনিস ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা পাত্র ঢেকে রাখো এবং পানপাত্রের মুখ বন্ধ করো; কেননা বছরের এমন একটি রাত রয়েছে যে রাতে মহামারি নেমে আসে, আর উন্মুক্ত কোনো পাত্র পেলে তাতে সেই সংক্রমণ প্রবেশ করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০১৪)

আজ মানুষের লাগামহীন ভোগলিপ্সার কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, বরফ গলছে এবং ঋতুচক্র ওলটপালট হচ্ছে। কোরআন শত শত বছর আগেই এই আত্মঘাতী প্রবণতার পরিণতি জানিয়ে মানুষকে সতর্ক করেছিল, “মানুষের কৃতকর্মের কারণেই জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদের কোনো কোনো কর্মের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করান, যাতে তারা সঠিক পথে ফিরে আসে।” (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)

অন্য আয়াতে বিধ্বংসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, “পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তোমরা তাতে কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৫৬)

পরিচ্ছন্নতার এই তাগিদ ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে প্রকাশ্য পরিসরেও বিস্তৃত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন; তিনি পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন... অতএব তোমরা তোমাদের আঙিনাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯)

এ কারণেই তৃতীয় খলিফা আলী (রা.) জনপথ ও উন্মুক্ত স্থানে ময়লা পানি বা পয়োনিষ্কাশনের নালা বের করা আইনত নিষিদ্ধ করেছিলেন। (আব্দুর রাজ্জাক আস-সানআনি, আল-মুসান্নাফ, ১০/৬৩, আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত, ১৯৮৩)

নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন; তিনি পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন... অতএব তোমরা তোমাদের আঙিনাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯

এমনকি পানির উৎস, পথচারীদের চলার রাস্তা কিংবা মানুষ যেখানে ছায়ায় বিশ্রাম নেয়—সেসব স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রাসুল (সা.)। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬)

পরিবেশ সংরক্ষণের সবচেয়ে সংবেদনশীল দৃষ্টান্ত মেলে যুদ্ধকালীন বিধানে। চরম সংঘাতের মুহূর্তেও প্রকৃতি যেন প্রতিহিংসার শিকার না হয়, সে বিষয়ে প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) সিরিয়াগামী সেনাদলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তোমরা কোনো ফলবান বৃক্ষ কর্তন করবে না, কোনো শস্যক্ষেত বা খেজুরবাগান আগুনে জ্বালিয়ে দেবে না, খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া কোনো গবাদিপশু বধ করবে না এবং কোনো জনবসতি ধ্বংস করবে না।” (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২/৭৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

শেষ কথা

ইসলাম পরিবেশের মূলনীতি ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি পরিবর্তিত যুগে জনস্বার্থে কঠোর আইন তৈরির পূর্ণ সুযোগ রেখেছে। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মাসালিহে মুরসালাহ’ বা বৃহত্তর জনকল্যাণমুখী নীতি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নদী দখলমুক্ত করা, কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য রোধ, একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ কিংবা বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো রাষ্ট্রীয় নীতিমালা মূলত ইসলামের এই বৃহত্তর নীতিরই প্রতিফলন।

প্রকৃতিকে রক্ষা করা শুধু কোনো পরিবেশবাদী সংস্থার প্রচারপত্র কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়; একজন বিশ্বাসী মানুষের কাছে এটি স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহারের আমানত রক্ষা করার এক গভীর আত্মিক দায়। মাটি ও বাতাসের প্রতি আমাদের মানবিক আচরণই আসলে ঠিক করে দেয় আমরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক।

আরও পড়ুন