ইরাকের রমজান যেন প্রাচীন ব্যবিলনীয়, সুমেরীয় এবং আব্বাসীয় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও ইরাকিদের হৃদয়ের প্রশস্ততা এবং আতিথেয়তায় কোনো ভাটা পড়েনি।
বিশ্বের প্রথম ‘কুকবুক’
ইরাকিদের রান্নার হাত হাজার বছরের পুরনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের তিনটি প্রাচীন মাটির ফলক বা কিউনিফর্ম স্ক্রিপ্টকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম রান্নার বই।
মজার ব্যাপার হলো, সেই সাড়ে তিন হাজার বছর আগের ‘তশরীব’ বা ‘খুবজ আল-আরুক’ (বিশেষ রুটি) আজও ইরাকি ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইফতারের রাজকীয় পদ
ইরাকের ইফতারে মাছের প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো, যা অন্য অনেক আরব দেশে বিরল।
মাসকুফ: এটি ইরাকের জাতীয় খাবার। কার্প জাতীয় মাছকে পিঠের দিক দিয়ে চিরে বিশেষ মশলায় মাখানো হয়। এরপর কাঠের খুঁটিতে গেঁথে আগুনের পাশে রেখে অত্যন্ত ধীরগতিতে ঝলসানো হয়। ৪,৫০০ বছর আগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও এই মাসকুফ রান্নার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দোলমা ও দুলাইমিয়া: আঙুর পাতা বা সবজির ভেতরে মাংস ও চালের পুর দিয়ে তৈরি ‘দোলমা’ এবং আম্বার চালের ওপর খাসির মাংস দিয়ে সাজানো ‘দুলাইমিয়া’ ইরাকি আভিজাত্যের প্রতীক।
আংটি খোঁজার রোমাঞ্চকর খেলা
ইরাকের রমজানের রাতগুলো মোটেও নিস্তব্ধ নয়। তারাবির নামাজের পর শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘মাহিবুস’ খেলা।
এটি মূলত দুটি বড় দলের মধ্যে আংটি লুকানোর লড়াই। এক পক্ষ হাতের মুঠোয় আংটি লুকিয়ে রাখে, আর অন্য পক্ষকে কেবল মানুষের চোখের ভাষা আর অভিব্যক্তি দেখে খুঁজে বের করতে হয় আংটিটি কার কাছে।
জয়ী দলকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় ‘জনুদ আল-সিত’ (ক্রিম ভরা পেস্ট্রি) বা ‘বাকলাভা’র মতো সুস্বাদু মিষ্টি। এই খেলা দেখতে মাঝেমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ক্যাফেগুলোতে ভিড় করেন।
মুসাহারাতি ও ‘মাজিনা’র সুর
মুসাহারাতি: ইরাকে সাহ্রির সময় যারা ডাক দেন, তাদের বলা হয় ‘মুসাহারাতি’ বা ‘আবু দাম্মাম’। তারা বড় ড্রাম বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান। ইরাকিরা এতোটাই অতিথি পরায়ণ যে অনেক সময় মুসাহারাতিকে নিজেদের দস্তরখানে বসিয়ে একসাথে সাহ্রি করান।
মাজিনা: রমজানের মাঝামাঝি সময়ে (১৫ রমজান) ইরাকি শিশুরা ‘মাজিনা ইয়া মাজিনা’ গান গেয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। এটি অনেকটা আমাদের দেশের উৎসবের মতোই, যেখানে বড়রা শিশুদের হাতে মিষ্টি ও উপহার তুলে দেন।
পানীয় ও আড্ডা: ‘ইস্তিকান’ চা
ইরাকি ইফতারে ‘নুমি বাসরা’ (শুকনো লেবুর শরবত) এবং কিশমিশের শরবত সবচেয়ে জনপ্রিয়। আর ইফতার পরবর্তী সময়ে চলে কয়লার আগুনে তৈরি কড়া লিকারের চা।
এই বিশেষ আকৃতির ছোট গ্লাসকে তারা বলে ‘ইস্তিকান’। মনে করা হয়, ব্রিটিশ আমলের ‘East Tea Can’ কথাটি থেকেই এই নামের উৎপত্তি।