পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে আমাদের শেখানো হয় যে ব্যবসা–বাণিজ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন করা কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ইসলামি জীবনদর্শনে ব্যবসার সংজ্ঞা শুধু লাভ–ক্ষতির অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্যবসা হলো সমাজকে সেবা দেওয়ার এবং সেখানে কল্যাণ ও ইতিবাচক পরিবর্তন যুক্ত করার অন্যতম মাধ্যম।
একটি ব্যবসা যদি অঢেল অর্থ উপার্জন করে কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে, ভেজাল পণ্য সরবরাহ করে কিংবা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সেই ব্যবসা তার মূল উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ হয়েছে।
একজন মুসলিম উদ্যোক্তা যখন এই নিয়ত নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন যে তাঁর কাজ দিয়ে সমাজের মানুষের উপকার হবে এবং তিনি সৎ উপায়ে হালাল রিজিক অন্বেষণ করবেন, তখন সেই ব্যবসাই তাঁর জন্য ইবাদতে পরিণত হয়।
সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী পরকালে নবী, সত্যনিষ্ঠ এবং শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)
মুমিনের ব্যবসায় কীভাবে বরকত আসতে পারে, তার ৩টি কারণ দেখানো হলো।
১. ক্ষতি স্বীকার করেও মানুষের পাশে দাঁড়ানো
উপার্জন করার চেয়েও ব্যবসা পরিচালনার সবচেয়ে কঠিন দিক হলো প্রাত্যহিক কার্যক্রমে ‘ইহসান’ (সৌহার্দ্য ও সৌন্দর্য) এবং ‘আদল’ (ইনসাফ) বজায় রাখা—এমনকি যদি তা করতে গিয়ে সাময়িক আর্থিক ক্ষতিও মেনে নিতে হয়।
প্রচলিত ব্যবসায়িক লাভ–ক্ষতির গণনায় একে ‘অযৌক্তিক আর্থিক ক্ষতি’ মনে হতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর বিচারে এই ভালোবাসাই ব্যবসাকে বরকতময় করে তোলে।
ব্যবসায়ী বন্ধুদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো প্রজেক্টে কাজ করার সময় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক বা সাব–কন্ট্রাক্টর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়লে প্রচলিত আইন তাঁকে বাড়তি টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেয় না বটে।
কিন্তু একজন মুমিন উদ্যোক্তা শুধু আত্মিক দায়বদ্ধতা থেকে সেই কর্মীর সহায়তা চালিয়ে যান।
প্রচলিত ব্যবসায়িক লাভ–ক্ষতির গণনায় একে ‘অযৌক্তিক আর্থিক ক্ষতি’ মনে হতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর বিচারে এই ভালোবাসাই ব্যবসাকে বরকতময় করে তোলে।
কোরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, ইহসান (উত্তম আচরণ) এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯০)
২. নিয়োগে সততা, বিদায়ে সম্মান
প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগ বা এইচআর পলিসির ক্ষেত্রে ইসলাম দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়—দক্ষতা ও সততা।
কোরআনে নবী শোআইবের কন্যার উক্তি উল্লেখ করে কর্মী নিয়োগের মূলনীতি তুলে ধরা হয়েছে, ‘তাদের (কন্যাদের) একজন বলল: বাবা, আপনি তাঁকে মজুরি দিয়ে নিযুক্ত করুন; নিশ্চয়ই আপনার মজুর হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সেই উত্তম, যে শক্তিশালী (দক্ষ) ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬)
কোনো কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না কিংবা তাঁকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন আকস্মিক চাকরিচ্যুত না করে বরং মর্যাদার সঙ্গে বিদায় জানানো উচিত।
একইভাবে, কোনো কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না কিংবা তাঁকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন আকস্মিক চাকরিচ্যুত না করে বরং মর্যাদার সঙ্গে বিদায় জানানো উচিত। তাঁকে নতুন কাজ খুঁজে নিতে সুনির্দিষ্ট সময় ও সুযোগ দেওয়া এক মহৎ মানবিকতার পরিচয়।
৩. বরকতের প্রার্থনা করা
ব্যবসা শুধু অর্থ কামানোর যন্ত্র নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এবং বান্দাদের সেবা করার এক ইবাদত। ব্যবসা ও উপার্জনে বরকত লাভের জন্য মহানবী (সা.) প্রতিদিন সকালে একটি দোয়া পাঠ করার শিক্ষা দিয়েছেন:
বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজকান তাইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালা।’
বাংলা অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র ও হালাল রিজিক এবং গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯২৫)
আসুন, আমাদের প্রাত্যহিক ব্যবসা–বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রে শুধু বস্তুগত লাভের পেছনে না ছুটে নীতি, আমানতদারি, কর্মচারীদের প্রতি দয়া এবং সামাজিক কল্যাণের এই ‘বরকত কালচার’ গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদের উপার্জনে ও ব্যবসায়িক প্রচেষ্টায় বরকত দান করুন।