সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

তায়েফের একটি মসজিদছবি: উইকিপিডিয়া

হিজরি নবম বছরে তায়েফের সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদলের মদিনায় আগমন এবং তাদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি নবীজির দাওয়াতের এক অনন্য কৌশল ও প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে।

পবিত্র কোরআনের ভাষায়, “বলো, এটিই আমার পথ; আমি আল্লাহর দিকে ডাকি সজাগ দৃষ্টি বা প্রজ্ঞার সঙ্গে।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৮)

তায়েফের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মক্কা ও মদিনার পর তায়েফ ছিল হিজাজ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান নগরী। কোরাইশদের সঙ্গে সাকিফ গোত্রের ব্যবসায়িক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল গভীর। নবুয়তের দশম বছরে নবীজি (সা.) যখন তায়েফে দাওয়াত নিয়ে যান, তখন তারা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

এমনকি মদিনায় ইসলামি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পর অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধের পরও সাকিফ গোত্র তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গের ভেতর অবরুদ্ধ থেকে অবাধ্যতা জারি রাখে।

কিন্তু নবম হিজরিতে যখন আরবের চারপাশ থেকে ইসলামের বিজয়বার্তা আসতে শুরু করে, তখন তারা বাধ্য হয়ে আলোচনার জন্য মদিনায় প্রতিনিধিদল পাঠায়।

আরও পড়ুন

সাকিফ গোত্রকে নবীজির দাওয়াতি কৌশল

১. অনন্য আতিথেয়তা: নবীজি (সা.) সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদলকে মদিনার মসজিদে নববীর ভেতরে তাঁবু খাটিয়ে থাকার ব্যবস্থা করেন। যদিও তারা তখনো মুশরিক ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল তারা যেন কাছ থেকে মুসলমানদের ইবাদত ও সুন্দর আখলাক পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, “মুশরিকদের মসজিদে থাকার অনুমতি দেওয়া জায়েজ, বিশেষ করে যদি তাদের ইসলাম গ্রহণের আশা থাকে এবং তারা কোরআন শোনার সুযোগ পায়।” (জাদুল মাআদ, ৩/৭৫১)

২. দীর্ঘ আলোচনা: নবীজি (সা.) প্রতি রাতে এশার নামাজের পর নিজে গিয়ে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় গল্প করতেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিতেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে তাঁর পায়ে কষ্ট হলেও তিনি তাদের প্রতি বিরক্ত হননি।

হজরত আউস বিন হুজাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) তাদের সঙ্গে তাঁর মক্কী জীবনের কষ্টের কথা শেয়ার করতেন এবং ধৈর্য ধরে তাদের কথা শুনতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৯৩)

৩. আদর্শে অবিচলতা: সাকিফ গোত্র ইসলাম গ্রহণের শর্ত হিসেবে মদ, ব্যভিচার ও সুদ বৈধ করার দাবি জানায়। কারণ তায়েফের অর্থনীতি ও বিনোদন ছিল এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে।

কিন্তু মহানবী (সা.) এই মৌলিক হারামের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেননি। তারা যখন নামাজ না পড়ার শর্ত দিল, তখন তিনি কালজয়ী এক কথা বললেন, “যে ধর্মে রুকু (নামাজ) নেই, তাতে কোনো কল্যাণ নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৯১৩)

৪. নমনীয়তার নীতি: মৌলিক ইবাদত ও হারামের প্রশ্নে আপস না করলেও নবীজি (সা.) কৌশলগত কিছু বিষয়ে তাদের ছাড় দেন। যেমন: তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ওপর জাকাত ও জিহাদ ফরজ না করার প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি জানতেন, একবার অন্তরে ঈমান প্রবেশ করলে তারা নিজেরাই এগুলো পালন করবে। পরবর্তীকালে দেখা গেছে, আরবের বহু গোত্র বিধর্মী হয়ে গেলেও সাকিফ গোত্র ইসলামে অবিচল ছিল। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩০২৫)

আরও পড়ুন

৫. সামাজিক বাস্তবতা: সাকিফ গোত্র তাদের দেবী ‘লাত’–এর মূর্তি নিজেদের হাতে ভাঙতে ভয় পাচ্ছিল। তারা আশঙ্কা করছিল, এতে তাদের ওপর কোনো অভিশাপ আসবে। নবীজি (সা.) তাদের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা মেনে নিয়ে বলেন, “তোমাদের নিজ হাতে মূর্তি ভাঙতে হবে না, আমি লোক পাঠিয়ে এটি করিয়ে দেব।”

তিনি খালেদ বিন ওয়ালিদ ও মুগিরা বিন শুবার নেতৃত্বে একটি দল পাঠিয়ে মূর্তিটি ধ্বংস করেন এবং সেই স্থানেই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৪৩)

৬. আভিজাত্যের মর্যাদা: সাকিফ গোত্রের মানুষের মধ্যে বংশীয় আভিজাত্যবোধ ছিল প্রবল। নবীজি (সা.) তাদের প্রতিনিধিদলের যোগ্য ব্যক্তিদেরই তাদের নেতা হিসেবে বহাল রাখেন। ওসমান ইবনে আবুল আস (রা.) কোরআন শিক্ষায় মনোযোগী ছিলেন বলে তাঁকে তায়েফের ইমাম ও আমীর নিযুক্ত করেন।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ফিরে গিয়ে তাদের গোত্রকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৩/৫২৬)

সারকথা

সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাদের শেখায় যে, কঠোরতা নয় বরং ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে দাওয়াত দেওয়াই ইসলামের পদ্ধতি। দাওয়াতের ক্ষেত্রে মৌলিক আদর্শে অটল থেকে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নমনীয় হওয়া একটি সফল আন্দোলনের অপরিহার্য গুণ।

আরও পড়ুন