মক্কা-মদিনা কেন মুসলমানদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ

ছবি: পেক্সেলস

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের দুই বিলিয়নের বেশি মুসলিমের আত্মিক মানচিত্রে যে দুটি শহর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং পরম আশ্রয়ের নাম, তা হলো মক্কা ও মদিনা।

এই দুটি শহর কেবল আরব অঞ্চলের কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ইতিহাস ও বিশ্বাসের মূল উৎস।

১. ইসলাম ধর্মের সূচনা

মক্কা ও মদিনা শহর দুটির প্রতি মুসলিমদের এই অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রধান কারণ হলো এগুলো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান প্রথম মুহূর্তগুলোর জীবন্ত সাক্ষী।

এই পবিত্র ভূমিতেই মানবজাতির মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এখানেই তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে এবং এখানেই তিনি নবুয়তের মহান দায়িত্বে অভিষিক্ত হয়েছিলেন।

মক্কা ও মদিনার প্রতিটি ধূলিকণা ও পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওহি নাজিল হওয়ার এবং একটি নির্যাতিত অবহেলিত উম্মাহর বিশ্বজয়ের সংগ্রামী ইতিহাস।

সবচেয়ে বড় কথা, এই দুই শহরেই সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, যা ছিল আসমান ও জমিনের মধ্যে ঐশ্বরিক যোগাযোগের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ধারা।

মক্কা ও মদিনার প্রতিটি ধূলিকণা ও পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওহি নাজিল হওয়ার এবং একটি নির্যাতিত অবহেলিত উম্মাহর বিশ্বজয়ের সংগ্রামী ইতিহাস। সিরাত গবেষকদের মতে, এই দুটি শহরের ইতিহাস জানা মানেই ইসলামের মূল শিকড়কে জানা।

কাবা শরিফ

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উভয় বিচারেই মক্কা শহরটি একক ও অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত। এটিকে পৃথিবীর বুকে একত্ববাদের আদি কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। মক্কার বুকেই অবস্থিত কাবা শরিফ; যা মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত পৃথিবীর প্রথম ঘর।

আদি পিতা আদম (আ.) কর্তৃক এটি নির্মিত হওয়ার পর দীর্ঘকাল তা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে ইব্রাহিমীয় ধর্মের মূল পুরুষ, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে এই পবিত্র ঘরের পুনর্নির্মাণ করেন।

আরও পড়ুন

মক্কা শুধু নামাজের কিবলাই নয়, এটি ইসলাম ধর্মের পঞ্চম মূল স্তম্ভ ‘হজ’-এর প্রধান গন্তব্য। প্রতিবছর পৃথিবীর বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ভুলে লাখো মুসলিম এই এক কাবার চত্বরে এসে সমবেত হন, যা মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের দৃশ্য তৈরি করে।

পবিত্র কোরআনে মক্কা ও কাবার এই অনন্য মর্যাদা ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত, এটি বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েতের আলো। এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যেমন ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর স্থান (মাকামে ইব্রাহিম)। আর যে কেউ এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপত্তা লাভ করে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬-৯৭)

মদিনার মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজ
ছবি: পেক্সেলস

মদিনা: নবীর শহর

মক্কার পরেই মুসলিমদের হৃদয়ে যে শহরটি সবচেয়ে মধুর স্থান দখল করে আছে, তা হলো মদিনা মুনাওয়ারাহ বা আলোকিত শহর। হিজরতের আগে এই শহরের নাম ছিল ‘ইয়াসরিব’।

মক্কার কোরাইশদের নির্মম নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে রাসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা এই শহরে আশ্রয় নেন। মদিনার আনসার বা সাহায্যকারীরা মুহাজিরদের যেভাবে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ।

মদিনা শুধু আশ্রয়ের শহর ছিল না, এখানেই ইসলামের প্রথম বহুত্ববাদী সমাজ ও স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার পত্তন ঘটেছিল। এখানেই তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও মানবাধিকারের আদি দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই মদিনার বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর পবিত্র রওজা মোবারক জিয়ারতের ব্যাকুলতা প্রতিটি মুসলিমকে আজীবন তাড়িত করে বেড়ায়।

নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত, এটি বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েতের আলো। (
সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬-৯৭

হারামাইনের আইনি মর্যাদা

ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহের দৃষ্টিতে মক্কা ও মদিনাকে ‘হারামাইন’ বা দুটি বিশেষ সুরক্ষিত ও পবিত্র সীমানা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য যেকোনো সাধারণ মসজিদের চেয়ে এই দুই শহরের আইনি ও পরিবেশগত বিধিবিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর যেকোনো সাধারণ মসজিদে অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার বা পরিদর্শনের অনুমতি থাকলেও মক্কা ও মদিনার পবিত্র সীমানার ভেতরে অমুসলিমদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আরও পড়ুন

শুধু তা-ই নয়, মক্কা ও মদিনা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই দুই পবিত্র অঞ্চলের সীমানার ভেতরে কোনো মানুষকে হুমকি দেওয়া, যুদ্ধবিগ্রহ করা তো দূরের কথা, যেকোনো বন্য প্রাণী বা পশুপাখিকে সামান্য কষ্ট দেওয়াও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

এমনকি এখানকার প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কোনো গাছপালা বা ঘাস কাটার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই হজরত ইব্রাহিম (আ.) মক্কাকে পবিত্র নিরাপদ নগরী (হারাম) ঘোষণা করেছিলেন এবং এর অধিবাসীদের জন্য দোয়া করেছিলেন। আর আমিও মদিনাকে একইভাবে পবিত্র ও নিরাপদ ঘোষণা করছি, যেভাবে ইব্রাহিম মক্কাকে করেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১২৯)

নবী ইব্রাহিমের সেই ঐতিহাসিক দোয়ার বিবরণ কোরআনেও এসেছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, এই শহরকে শান্তির শহরে পরিণত করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করুন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬)

মক্কার হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব অন্য মসজিদের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি এবং মদিনার মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজের সওয়াব এক হাজার গুণ বেশি।

সওয়াবের প্রাচুর্য

পৃথিবীর যেকোনো মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত নফল নামাজ (তাহিয়্যাতুল মসজিদ) পড়ার নিয়ম থাকলেও মক্কার কাবার চত্বরে প্রবেশের প্রথম অভিবাদন হলো কাবার চারপাশ ‘তাওয়াফ’ বা প্রদক্ষিণ করা।

একইভাবে মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময়ও বিদায়ী তাওয়াফ করা সুন্নাহসম্মত নিয়ম।

তা ছাড়া এই দুই পবিত্র মসজিদে নামাজের সওয়াব বা প্রতিদানের পরিমাণও বহুগুণ বেশি। মক্কার হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব অন্য মসজিদের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি এবং মদিনার মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজের সওয়াব এক হাজার গুণ বেশি। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৩/৬৩, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৯৮৬)

এই বিপুল আত্মিক লাভ ও পুণ্য অর্জনের আশায় প্রতিবছর লাখ লাখ মুমিন নিজেদের জমানো সব পুঁজি খরচ করে এই দুই শহরের দিকে ছুটে যান। যুগের পর যুগ ধরে পৃথিবীর বুক থেকে কত সাম্রাজ্য ও শহর বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু মক্কা ও মদিনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ ও ভালোবাসা দিন দিন আরও প্রগাঢ় হচ্ছে।

আরও পড়ুন