জ্ঞানের সীমা: ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার বিনয়তত্ত্ব

যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে না, তা হিকমায় উন্নীত হয়নিছবি: এআই / প্রথম আলো

মানুষ জ্ঞানী, কিন্তু সর্বজ্ঞ নয়। এই সত্য ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বকে তার স্বাভাবিক বিনয়ের দিকে দাওয়াত করে। যে দর্শন মানুষের জানাকে স্বীকার করে, কিন্তু তার না জানাকেও সমান গুরুত্ব দেয়, সেই দর্শন জ্ঞানের প্রকৃত সীমারেখা উপলব্ধি করতে পারে।

কারণ, সেরেফ জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই জ্ঞান আসে না, জ্ঞানের পয়লা শর্ত নিজের সীমা জানার প্রজ্ঞা। যে আকল নিজের সীমাকে অস্বীকার করে, সে ধীরে ধীরে জ্ঞান থেকে মতাদর্শে, অনুসন্ধান থেকে আধিপত্যে ও প্রজ্ঞা থেকে অহংকারে রূপান্তরিত হয়।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় জ্ঞানের সীমা সত্য অনুসন্ধানের নৈতিক শর্ত।

অন্তর্দৃষ্টি সত্যের একটি দরজা, কিন্তু একমাত্র দরজা নয়। যে দর্শন কেবল অনুভূতির ওপর দাঁড়ায়, সে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই সীমার ধারণা অস্তিত্বের স্তরবিন্যাস থেকে উদ্ভূত। সমগ্র কায়েনাত একই রকম বাস্তবতা দিয়ে গঠিত নয়। এর একটি স্তর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, একটি স্তর বুদ্ধিগ্রাহ্য, একটি স্তর অভিজ্ঞতাগ্রাহ্য, একটি স্তর নৈতিক উপলব্ধির ও একটি স্তর গায়েবের।

ফলে সব বাস্তবতাকে একই পদ্ধতিতে জানা সম্ভব নয়। যে পদ্ধতি পাথরের ঘনত্ব নির্ণয় করতে সক্ষম, সেই পদ্ধতি ইনসাফের মর্যাদা নির্ণয় করতে পারে না। যে উপায়ে নদীর প্রবাহ পরিমাপ করা যায়, সে উপায়ে মানুষের বাতিনের তাকওয়া পরিমাপ করা যায় না।

আবার যে অনুভব ভালোবাসার সত্য উপলব্ধি করে, শুধু তার সাহায্যে দূরবর্তী নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা যায় না। বাস্তবতার স্তর ভিন্ন হলে জ্ঞানার্জনের পথও ভিন্ন হবে, এটাই ফিতরাতি জ্ঞানতত্ত্বের বনিয়াদি একরার ও স্বীকৃতি।

কাজেই পরীক্ষাগার জ্ঞানের একটি অপরিহার্য মাকাম হলেও সমগ্র জ্ঞানের একমাত্র আদালত নয়। পরীক্ষাগার এমন বিষয় নিয়ে কাজ করে, যেগুলো পুনরাবৃত্ত পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও পরীক্ষার আওতায় আসে। পদার্থ, শক্তি, জীবপ্রক্রিয়া, পরিবেশগত পরিবর্তন কিংবা জৈবিক সম্পর্ক সম্পর্কে তার অনুসন্ধান অতুলনীয়।

আরও পড়ুন

কিন্তু পরীক্ষাগারের নিজস্ব তরিকাই তাকে একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়। সে উদ্দেশ্যকে পরিমাপ করতে পারে না, অর্থকে ওজন করতে পারে না, সৌন্দর্যকে রাসায়নিক বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না এবং নৈতিক কর্তব্যকে কোনো যন্ত্রের সূচকে রূপান্তর করতে পারে না।

এগুলো তার অযোগ্যতার বিষয় নয়; বরং তার আলোচ্য বিষয়ের বাইরের আলাপ। এখানেই পদ্ধতিগত সীমা ও হাকিকতের সীমার তফাত বুঝতে হয়।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা একইভাবে শুধু অন্তর্দৃষ্টিকেও সর্বশক্তিমান বলে মনে করে না। মানুষের অন্তর বহু সময় সত্যের দিকে ইশারা করে। কিন্তু সেই অন্তরই নফস, অভ্যাস, ভয় ও আকাঙ্ক্ষার আবরণে আচ্ছন্ন হতে পারে।

অতএব অন্তর্দৃষ্টি সত্যের একটি দরজা, কিন্তু একমাত্র দরজা নয়। যে দর্শন কেবল অনুভূতির ওপর দাঁড়ায়, সে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আবার যে দর্শন কেবল পরিমাপের ওপর দাঁড়ায়, সে বাস্তবতার অদৃশ্য মাত্রাকে অস্বীকার করতে শুরু করে।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই উভয় চরমতা থেকে নিজেকে সংযত রাখে।

জ্ঞানের ইতিহাসে বহু বিপর্যয় ঘটেছে তখনই, যখন মানুষ সাময়িক জ্ঞানকে চূড়ান্ত জ্ঞান বলে ঘোষণা করেছে। একসময় বিজ্ঞান নিজেকে সব বাস্তবতার একমাত্র ভাষ্যকার মনে করেছে।

এখানেই ওহির জরুরত নতুনভাবে প্রতিভাত হয়। ওহি মানুষের অজানাকে বিলুপ্ত করতে আসে না। সে অজানার প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে। এমন বহু বিষয় আছে, যা মানুষের জ্ঞানগত অভিযাত্রার বাইরে নয়, আবার মানুষের স্বয়ংসম্পূর্ণ অনুসন্ধানের আওতারও মধ্যে নয়।

সৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, মৃত্যুর পরবর্তী বাস্তবতা, হিসাব, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, রূহের প্রকৃতি কিংবা আল্লাহর চূড়ান্ত সিফাতের মতো বিষয়ে মানুষের আকল প্রশ্ন করতে পারে, কিছু ইঙ্গিতও পেতে পারে, কিন্তু পূর্ণ জ্ঞান হাসিল করতে পারে না।

এখানে ওহি নতুন এমন এক আলোক, যা মানুষের অনুসন্ধানকে তার স্বাভাবিক সীমার বাইরে প্রলম্বিত করে। ফলে ওহি আকলের অপূর্ণতাকে পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত করে। অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় ‘না জানা’ কোনো শরমের বিষয় নয়; বরং না জানাকে যথার্থভাবে কবুল করাই প্রকৃত ইলমের আলামত।

আরও পড়ুন

জ্ঞানের ইতিহাসে বহু বিপর্যয় ঘটেছে তখনই, যখন মানুষ সাময়িক জ্ঞানকে চূড়ান্ত জ্ঞান বলে ঘোষণা করেছে। একসময় বিজ্ঞান নিজেকে সব বাস্তবতার একমাত্র ভাষ্যকার মনে করেছে, আবার কখনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার কিছু চার্চীয় রূপ নিজেদের সংশোধনের ঊর্ধ্বে ভেবেছে।

উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞানের অভাব মূল সমস্যা নয়, মূল সমস্যা হলো নিজেদের জ্ঞানের সীমা ভুলে যাওয়া। সীমা ভুলে যাওয়া মানেই মিজান হারিয়ে ফেলা।

এই বিনয়তত্ত্বের আরেকটি দিক হলো জ্ঞানের পরিধি যত বিস্তৃত হয়, অজ্ঞাতের পরিধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিশুর মনে হয় সে অনেক কিছু জানে। কিন্তু একজন প্রকৃত আলেম যত শেখেন, ততই উপলব্ধি করেন যে অজানার সমুদ্র তাঁর সামনে আরও প্রসারিত হচ্ছে। অতএব ইলমের পরিণতি আত্মপ্রসাদ নয়; বরং তাওয়াদু বা বিনয়।

যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে না, তা এখনো হিকমায় উন্নীত হয়নি।

যে নিজেকে সীমিত জানে, সে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে। যে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে, সে সত্যকে নিজের মালিকানা নয়; বরং আল্লাহর আমানত হিসেবে ধারণ করতে শেখে।

এই বিনয় যেভাবে ব্যক্তিগত চরিত্রের বিষয়, তেমনি সে সভ্যতারও বিষয়। যে সভ্যতা নিজের জ্ঞানকে চূড়ান্ত মনে করে, সে অন্য জ্ঞানধারাকে ধ্বংস করতে শুরু করে। সে প্রকৃতিকে সম্পদে, মানুষকে উপকরণে ও সংস্কৃতিকে পরিমাপযোগ্য তথ্যে রূপান্তরিত করে।

কিন্তু যে সভ্যতা নিজের সীমা স্বীকার করে, সে সংলাপ সৃষ্টি করে, নতুন সত্য গ্রহণ করে ও ভুল সংশোধনের নৈতিক শক্তি অর্জন করে। কারণ, সীমা কবুল করার মানে সত্যের প্রতি আনুগত্য।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে জ্ঞানের পরম দুশমন সীমাহীনতার বিভ্রম। মানুষ যখন মনে করে যে তার জানাই চূড়ান্ত জানা, তখন তলব থেমে যায়, সওয়াল নিষিদ্ধ হয় ও প্রজ্ঞার পরিবর্তে মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ কায়েনাতের প্রতিটি স্তর মানুষকে শিক্ষা দেয় যে সৃষ্টি প্রায় অসীম, আর মানুষ সীমিত।

এই সীমাবদ্ধতা মানুষের অপমান নয়। সীমাবদ্ধতা তার খিলাফতের শর্ত। কারণ, যে নিজেকে সীমিত জানে, সে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে। যে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে, সে সত্যকে নিজের মালিকানা নয়; বরং আল্লাহর আমানত হিসেবে ধারণ করতে শেখে।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে বিনয় একটি এপিস্টেমিক নীতি। জ্ঞানের প্রকৃত দরজা খুলে যায় তখনই, যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সে সবকিছু জানতে জন্মায়নি। যা জানা তার জন্য কল্যাণকর, তা যথার্থভাবে জানার জন্য সে জন্মেছে।

এই উপলব্ধি আকলকে অহংকার থেকে মুক্ত করে, অনুসন্ধানকে ইবাদতে রূপ দেয় ও ইলমকে হিকমার মোহনায় নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন