অন্তরে ‘মোহর’: যখন হেদায়েতের পথ বন্ধ হয়ে যায় 

ছবি: ম্যাগনিফিক

দয়াময় আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন এবং সত্য-মিথ্যা বেছে নেওয়ার বিবেক দিয়েছেন। কিন্তু পবিত্র কোরআনে এমন কিছু দুর্ভাগা মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাদের অন্তরে আল্লাহ সিলগালা করে দেন।

অন্তরে মোহর পড়ে গেলে সত্য বোঝার বা সুপথে ফিরে আসার সব যোগ্যতা মানুষ হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ পরম করুণাময় হওয়া সত্ত্বেও কেন একজন মানুষের অন্তরে মোহর মেরে দেন? আলোচনা করা হলো।

এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারীর অন্তরে মোহর মেরে দেন।
সুরা গাফির, আয়াত: ৩৫

১. অহংকার ও সত্য প্রত্যাখ্যান

সত্য যখন সুস্পষ্টভাবে সামনে আসে, তখন তা মেনে না নিয়ে শুধু অহংকারের বশবর্তী হয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলে অন্তরে মোহর পড়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারীর অন্তরে মোহর মেরে দেন।’ (সুরা গাফির, আয়াত: ৩৫)

ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনের ওপর নিজেকে বড় মনে করে এবং সত্যকে তাচ্ছিল্য করে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করে দেন যে সেখানে আর কোনো খোদায়ি আলো প্রবেশ করতে পারে না। (আত-তাবারি, জামিউল বয়ান ফি তাওয়িলিল কুরআন, ২১/৩৬৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)

আরও পড়ুন

২. ধারাবাহিকভাবে পাপকাজে লিপ্ত থাকা

পাপের পর অনুতপ্ত না হয়ে ধারাবাহিকভাবে তা করে গেলে অন্তরে কালো দাগ পড়তে শুরু করে। একসময় এই পাপের আস্তর পুরো হৃদয়কে ঢেকে মোহরের রূপ নেয়।

মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘মুমিন যখন কোনো পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সে যদি তওবা করে এবং পাপ থেকে ফিরে আসে, তবে অন্তর আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পাপ বাড়াতেই থাকে, তবে দাগটিও বাড়তে থাকে; একপর্যায়ে তা পুরো অন্তরকে গ্রাস করে নেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)

কোরআনে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাস বর্ণনায় বলা হয়েছে, বারবার আল্লাহর বিধান অমান্য ও ওয়াদা ভঙ্গের কারণেই তাদের অন্তরে মোহর মারা হয়েছিল।

৩. বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা

আল্লাহর সঙ্গে করা ইমানের চুক্তি কিংবা মানুষের সঙ্গে করা সামাজিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা অন্তরের মৃত্যু ডেকে আনে। কোরআনে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাস বর্ণনায় বলা হয়েছে, বারবার আল্লাহর বিধান অমান্য ও ওয়াদা ভঙ্গের কারণেই তাদের অন্তরে মোহর মারা হয়েছিল।

আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করার কারণে... আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন; ফলে অল্পসংখ্যক ছাড়া তারা ইমান আনবে না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৫৫)

আরও পড়ুন

৪. দুনিয়ার অন্ধ মোহ

যারা পরকালের অনন্ত জীবনকে ভুলে গিয়ে শুধু এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যায় এবং পার্থিব স্বার্থকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য অক্ষম করে দেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এটা এ জন্য যে তারা পরকালের চেয়ে দুনিয়ার জীবনকে বেশি ভালোবেসেছে... এরাই তারা, যাদের অন্তর, কান ও চোখের ওপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই হলো গাফেল বা উদাসীন।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০৭-১০৮)

মোনাফেকি হলো আত্মার একধরনের ক্যানসার, যা ধীরে ধীরে মানুষের আধ্যাত্মিক স্নায়ুগুলো অকেজো করে দেয়; ফলে অন্তরে মোহর পড়ে যায় এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার বোধ চিরতরে বিলুপ্ত হয়।
ইমাম গাজালি (রহ.)

৫. মোনাফেকি আচরণ

অন্তরে অবিশ্বাস লুকিয়ে রেখে মুখে ইমানের দাবি করা বা সুবিধাবাদী আচরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়ংকর অপরাধ। মোনাফেকরা বারবার ইমান আনে আবার কুফরিতে ফিরে যায়। এমন দ্বিমুখী আচরণের ফলে তাদের অন্তরে মোহর পড়ে যায়।

আল্লাহ বলেন, ‘এটা এ জন্য যে তারা ইমান আনার পর আবার কুফরি করেছে; ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে, তাই তারা এখন আর বুঝতে পারে না।’ (সুরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৩)

ইমাম গাজালি উল্লেখ করেছেন, মোনাফেকি হলো আত্মার একধরনের ক্যানসার, যা ধীরে ধীরে মানুষের আধ্যাত্মিক স্নায়ুগুলো অকেজো করে দেয়; ফলে অন্তরে মোহর পড়ে যায় এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার বোধ চিরতরে বিলুপ্ত হয়। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/১৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

হৃদয়ে মোহর পড়ে যাওয়া আল্লাহর কোনো প্রাথমিক শাস্তি নয়; বরং এটি মানুষের অবাধ্যতা, অহংকার ও বারবার সত্য প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত পরিণতি।

তাই মুমিনের উচিত সর্বদা নিজের অন্তরের সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে সেই দোয়াটি করা, যা মহানবী (সা.) সবচেয়ে বেশি করতেন, ‘হে অন্তরসমূহ পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের ওপর অবিচল রাখুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)

আরও পড়ুন