আল্লাহর ওপর ভরসা করার ৬ উপকারিতা

ছবি: এএফপি

ইসলামি জীবনদর্শনে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ইমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এই গুণের অধিকারী ব্যক্তি শুধু মানসিক প্রশান্তিই পান না, বরং দুনিয়া ও আখেরাতে বিশেষ মর্যাদাও লাভ করেন। তাওয়াক্কুলের ছয়টি উল্লেখযোগ্য লাভ নিচে আলোচনা করা হলো।

১. আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান

যিনি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করেন, আল্লাহ তাঁর সবকিছুর দায়দায়িত্ব নিজ জিম্মায় নিয়ে নেন। তখন ওই ব্যক্তির মনে কোনো জাগতিক পেরেশানি থাকে না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য সংকট থেকে উত্তরের পথ বের করে দেন এবং এমন স্থান থেকে তার জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন যা সে ভাবতেও পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তিনি তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে নবী, আপনার ও আপনার অনুসারী মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৪)

২. শত্রুর বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক সাহায্য

আল্লাহর ওপর ভরসাকারীকে তিনি কখনো শত্রুর হাতে ছেড়ে দেন না। বরং শত্রুর মোকাবিলা করার শক্তি ও সাহস জোগান। ইসলামের ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে।

সাহাবিদের তাওয়াক্কুল সম্পর্কে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যাদের লোকেরা বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে সেনা সংগ্রহ করা হয়েছে, সুতরাং তাদের ভয় করো। কিন্তু এই সংবাদ তাদের ইমান আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তারা বলে ওঠে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক। পরিণামে তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহ নিয়ে এমনভাবে ফিরে আসে যে বিন্দুমাত্র অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৩-১৭৪)

আরও পড়ুন

৩. বিনা হিসেবে জান্নাত লাভ

উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাঁরা হলেন সেই সব লোক, যাঁরা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতেন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হলো সেই সব লোক যারা অসুস্থ হলে তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করে না, কুলক্ষণ মানে না এবং আগুন দিয়ে দাগ লাগায় না, বরং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭০৫)

৪. জীবিকা লাভে বরকত

উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি অভাবনীয় রিজিকে অভাব দূর করেন। রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীর জীবিকা আল্লাহরই দায়িত্বে। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথার্থভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তবে তোমাদেরও তিনি পাখপাখালির মতো রিজিক দিতেন; যারা ভোরবেলা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফেরে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)

আরও পড়ুন

৫. জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা

তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে পরিবার ও সন্তান-সন্ততির সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। হজরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্রদের মিসরে পাঠানোর সময় আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কারও হুকুম চলে না। তাঁর ওপরেই আমি ভরসা করি এবং তাঁর ওপরেই ভরসাকারীদের ভরসা করা উচিত।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৭)

ফলে আল্লাহর রহমতে তাঁরা নিরাপদে সফর শেষ করে ফিরে এসেছিলেন।

৬. শয়তান থেকে সুরক্ষা

শয়তান মানুষের চিরশত্রু। কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা করলে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘গোপন সলাপরামর্শ তো কেবল শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, যাতে মুমিনরা কষ্ট পায়। কিন্তু আল্লাহর হুকুম না হলে সে তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর মুমিনদের কর্তব্য তো আল্লাহর ওপর ভরসা করা।’ (সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১০)

রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (অর্থাৎ: আল্লাহর নামে বের হলাম, তাঁর ওপরই আমার ভরসা, তিনি ছাড়া পাপ থেকে বাঁচা ও পুণ্য করার কোনো উপায় নেই) পাঠ করে, তখন শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪২৬)

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর

আরও পড়ুন