ইসলামের ‘সাত আসমান’

আল্লাহই সাত আসমান সৃষ্টি করেছেনছবি: পেক্সেলেস


সৃষ্টিজগতের বিশালতা আর অসীম রহস্য নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। এই কৌতূহলের একটি বড় অংশজুড়ে আছে আকাশের ধারণা। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘সপ্তাকাশ’ বা ‘সাত আসমান’ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক বিষয়।

পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে এবং হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় এই সাত আসমানের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপিত হয়—এই সাত আসমান বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে? এগুলো কি আমাদের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তর, নাকি এর বিস্তার দৃশ্যমান মহাবিশ্বেরও বাইরে?

আকাশ ও বেহেশত: সংজ্ঞাগত পার্থক্য

আলোচনার শুরুতে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে ইসলামি পরিভাষায় ‘আকাশ’ (সামা) এবং বেহেশত (প্যারাডাইস) সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। সাধারণ অর্থে আকাশ বলতে আমরা মাথার ওপরের নীলিমাকে বুঝি, কিন্তু কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ‘সপ্তাকাশ’ হলো একটি মহাজাগতিক কাঠামো।

বেহেশতের একশটি স্তর রয়েছে এবং প্রতি দুই স্তরের মধ্যবর্তী দূরত্ব আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। জান্নাতুল ফিরদাউস হলো এর সর্বোচ্চ স্তর, যার ওপরেই মহান আল্লাহর আরশ অবস্থিত।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৯০

অন্যদিকে বেহেশত হলো মুমিনদের জন্য পরকালীন পুরস্কারের স্থান, যা সপ্তম আকাশের ওপরে আরশের নিচে অবস্থিত।

সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বেহেশতের একশটি স্তর রয়েছে এবং প্রতি দুই স্তরের মধ্যবর্তী দূরত্ব আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। জান্নাতুল ফিরদাউস হলো এর সর্বোচ্চ স্তর, যার ওপরেই মহান আল্লাহর আরশ অবস্থিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৯০)

সুতরাং আসমান বা আকাশ হলো সেই বিশাল অবকাঠামো, যার ভেতরেই এই মহাবিশ্বের যাবতীয় নক্ষত্র ও ছায়াপথ অবস্থান করছে।

আরও পড়ুন

সপ্তাকাশের স্বরূপ: বায়ুমণ্ডল নাকি মহাবিশ্ব

আধুনিক বিজ্ঞান বায়ুমণ্ডলকে ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ারের মতো কয়েকটি স্তরে বিভক্ত করে। অনেকে কোরআনের ‘সাত আসমান’ বলতে এই স্তরগুলোকেই বোঝাতে চান।

কিন্তু কোরআনের বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারণাটি আংশিক সত্য হতে পারে মাত্র। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯)

এখানে পৃথিবীর সৃষ্টির বর্ণনার পরপরই সাত আসমানের কথা আসায় অনেকে একে পার্থিব বায়ুমণ্ডলের স্তর মনে করেন। তবে এর বিপরীতে ভিন্ন একটি শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।

সুরা ফুসসিলাতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশকে দুই দিনে সাত আসমানে পরিণত করলেন এবং প্রতিটি আসমানে তার বিধান ওহি করলেন; আর আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা (নক্ষত্ররাজি) দ্বারা সুশোভিত করেছি।’ (আয়াত: ১২)

পৃথিবীর সৃষ্টির বর্ণনার পরপরই সাত আসমানের কথা আসায় অনেকে একে পার্থিব বায়ুমণ্ডলের স্তর মনে করেন। তবে এর বিপরীতে ভিন্ন একটি শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।

এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ‘নিকটবর্তী আকাশ’ বা প্রথম আসমানকে নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করার কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিগুলো আমাদের বায়ুমণ্ডলে নয় বরং মহাকাশের অসীম শূন্যতায় অবস্থিত।

সুতরাং যদি সমস্ত দৃশ্যমান মহাবিশ্ব—তার কোটি কোটি ছায়াপথসহ—কেবল ‘প্রথম আসমানে’র অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে বাকি ছয়টি আসমানের বিশালতা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ‘মাল্টিভার্স’ বা বহু-মহাবিশ্ব তত্ত্বের সঙ্গে সপ্তাকাশের এই ধারণার একটি তাত্ত্বিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

কোরআন ও হাদিসে আরো যা আছে

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সাত আসমানের সুশৃঙ্খল বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। সুরা মুলকে আল্লাহ–তাআলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘যিনি সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন; দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?’ (আয়াত: ৩)

এই আয়াতগুলো ইঙ্গিত দেয় যে আসমানগুলো একটির ওপর আরেকটি অবস্থিত এবং এগুলোর গঠন অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সুসংবদ্ধ। (সুরা নাবা, আয়াত: ১২)

হাদিসশাস্ত্রের দিকে তাকালে আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মিরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের বর্ণনায় সাত আসমানের বিস্তারিত বিবরণ পাই। মিরাজের রাতে তিনি প্রতিটি আসমান অতিক্রম করেছিলেন এবং সেখানে নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

আরও পড়ুন

তবে মহাজাগতিক দূরত্ব বা আসমানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা তুলনামূলকভাবে দুর্বল (জয়িফ) সূত্রে বর্ণিত। যেমন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং এক আসমান থেকে অন্য আসমানের দূরত্বের কথা উল্লেখ আছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭২৩)

যদিও এই হাদিসটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে, তবু এটি সপ্তাকাশের বিশালত্বের একটি ধারণা দেয়।

সাত পৃথিবী: একটি তাত্ত্বিক আলোচনা

সাত আসমানের পাশাপাশি সাত পৃথিবীর প্রসঙ্গও ইসলামি তত্ত্বে উঠে এসেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহই সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ১২)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় দুটি প্রধান মত প্রচলিত। একদল মনে করেন, আমাদের এই পৃথিবীর অভ্যন্তরেই যে সাতটি স্তর (ক্রাস্ট থেকে কোর পর্যন্ত) রয়েছে, এখানে তা–ই বোঝানো হয়েছে।

আসমানসমূহ একটির ওপর আরেকটি ছাতার মতো অবস্থিত।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) , তাফসিরু কুরআনিল আজিম

অন্য দল মনে করেন, মহাবিশ্বের বিশালতায় আমাদের পৃথিবীর মতোই আরও সাতটি (বা সাতটি স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা) পৃথিবীসদৃশ গ্রহ রয়েছে, যা প্রতিটি আসমানে বিস্তৃত। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানও পৃথিবীসদৃশ বা ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এ থাকা গ্রহের সম্ভাবনাকে নাকচ করে না।

প্রাচীন ব্যাখ্যা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয়

কোরআনের প্রাচীন মুফাসসিরগণ সপ্তাকাশের আলোচনাকে মহান আল্লাহর অসীম কুদরত হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন, আসমানসমূহ একটির ওপর আরেকটি ছাতার মতো অবস্থিত। (ইবনে কাসির, তাফসিরু কুরআনিল আজিম, ২/২৩, দারু তাইয়িবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)

বর্তমান সময়ের চিন্তাবিদগণ মনে করেন, সাত আসমান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি সমগ্র সৃষ্টির এক অনন্য বিন্যাস। যদি প্রথম আসমানই আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব হয়, যা প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বিস্তৃত, তবে বাকি আসমানগুলো হয়তো এমন মাত্রায় অবস্থিত, যা বর্তমান মানবীয় প্রযুক্তিতে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, সাত আসমান কেবল একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়, বরং এটি স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আকাশ পৃথিবীর স্তরে স্তরে বিন্যস্ত হওয়া, নক্ষত্ররাজি দ্বারা প্রথম আসমান সুশোভিত থাকা এবং এর ঊর্ধ্বজগতে আল্লাহর আরশ ও জান্নাতের অবস্থান—এই সবকিছুই মুমিনের দৃষ্টিতে এক সুশৃঙ্খল মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ।

আরও পড়ুন