এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে সেই পরম শান্তির আবাসের কথা কল্পনা করুন, যেখানে রয়েছে সোনার রূপার ইট, সুবাসিত কস্তুরির সিমেন্ট, মুক্তা ও নীলকান্তমণির কাঁকর এবং জাফরানের শুভ্র মাটি।
সেখানে রয়েছে বহমান স্ফটিক স্বচ্ছ নদী, মণিমুক্তার রাজপ্রাসাদ, অতুলনীয় ফলমূল ও সুস্বাদু পানীয়। এমন এক অপূর্ব স্থানে নিজের প্রিয়জনদের সঙ্গে চিরদিনের জন্য বসবাস করার অনুভূতি কেমন হতে পারে, যেখানে নেই কোনো কষ্ট, নেই কোনো রোগশোকে জরাগ্রস্ত হওয়ার ভয়!
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করবে, সে চরম আনন্দে থাকবে এবং কখনো কষ্ট পাবে না; সে চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং কখনো মরবে না; তাদের পোশাক কখনো পুরোনো হবে না এবং তাদের যৌবন কখনো মিলিয়ে যাবে না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮০৪৩)
অনেকেই ভাবেন, ‘আমার যে ইমান বা আমল, তাতে কি আর ওই উঁচু স্তরে পৌঁছানো সম্ভব? কোনোমতে বেহেশতের এক কোণে একটু জায়গা পেলেই তো আমি ধন্য!’
কিন্তু নবীজি বলেছেন, তোমরা যখন মহান আল্লাহর কাছে বেহেশত প্রার্থনা করবে, তখন ফেরদাউস বেহেশত প্রার্থনা করবে। কারণ এটি হলো বেহেশতের মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ অংশ, আর এর ঠিক ওপরেই রয়েছে পরম দয়াময় আল্লাহর আরশ এবং এখান থেকেই বেহেশতের ঝরনাধারাগুলো প্রবাহিত হচ্ছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৯০)
কোথায় সেই বেহেশত
বেহেশতের সব স্তরের চূড়ায় অবস্থান করছে বেহেশতুল ফেরদাউস।
নবীজি বলেছেন, এটি হলো বেহেশতের মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ অংশ, আর এর ঠিক ওপরেই রয়েছে পরম দয়াময় আল্লাহর আরশ এবং এখান থেকেই বেহেশতের ঝরনাধারাগুলো প্রবাহিত হচ্ছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৯০)
সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র, উজ্জ্বল, সম্মানিত ও সর্বোচ্চ স্থান হলো পরম দয়াময় আল্লাহর আরশ। ফেরদাউস হলো বেহেশতের সেরা অংশ, কারণ তার ছাদ হলো আল্লাহর আরশ।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম লিখেছেন যে সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র, উজ্জ্বল, সম্মানিত ও সর্বোচ্চ স্থান হলো পরম দয়াময় আল্লাহর আরশ। তাই কোনো সৃষ্টি বা স্থান আরশের যত কাছাকাছি হবে, তা তত বেশি আলোকিত, বিশুদ্ধ ও মর্যাদাবান হবে। এই কারণেই ফেরদাউস হলো বেহেশতের সেরা অংশ, কারণ তার ছাদ হলো আল্লাহর আরশ। (ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়াইদ, পৃষ্ঠা ২৭, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)
ফেরদাউস অর্জনের ৫ আমল
সর্বোচ্চ বেহেশচ ফেরদাউস পাওয়ার জন্য প্রাত্যহিক জীবনে পাঁচটি বিশেষ আমল অভ্যাস করা যেতে পারে:
১. সুদৃঢ় ইমান ও সৎকর্ম: কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফেরদাউস বেহেশতে। (সুরা কাহফ, আয়াত: ১০৭)
সাধারণ ইমানদাররা উচ্চ মর্যাদার বেহেশতিদের এতটাই উঁচুতে দেখতে পাবে, যেমন মানুষ পূর্ব বা পশ্চিম দিগন্তে জ্বলজ্বলে তারা দেখে।
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, ওই উঁচু স্থানগুলো কি শুধু নবীদের জন্য নির্ধারিত?’ তখন মহানবী (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, না, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তারা হলো সেইসব মানুষ যারা আল্লাহর ওপর সুদৃঢ় ইমান এনেছে এবং রাসুলদের বাণী সত্য বলে মেনে নিয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৫৬)
২. বেশি বেশি সেজদা করা: সাহাবি রবিআ ইবনে কাব আসলামি (রা.) নবীজির খেদমত করতেন। একদিন মহানবী (সা.) সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে কিছু চাইতে বললেন।
রবিআ বললেন, ‘আমি বেহেশতে আপনার সঙ্গ চাই।’ নবীজি বললেন, তবে বেশি বেশি সেজদা করে এই কাজে আমাকে সাহায্য করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৯)
জীবনের প্রতিটি অর্জনে শুকরিয়ার সেজদা দেওয়া ও নফল নামাজের মাধ্যমে সেজদার সংখ্যা বাড়ানো ফেরদাউসের পথ সুগম করে।
৩. এতিমের দায়িত্ব নেওয়া: মহানবী (সা.) নির্দেশ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো এতিমের দায়িত্ব নেয়—সে তার নিজের আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়, আমি এবং সে বেহেশতে এই দুটির মতো পাশাপাশি থাকব (শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালেন)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৩)
বেহেশতে নবীজির পাশে থাকার অর্থই হলো সর্বোচ্চ বেহেশত ফেরদাউসে স্থান পাওয়া।
যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তিনবার বেহেশত প্রার্থনা করে, বেহেশত তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলে, ‘হে আল্লাহ, তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাও।’
৪. কোরআন হিফজ করা: পরকালে কোরআনের হাফেজকে বলা হবে, পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো; তুমি দুনিয়াতে যেভাবে ধীরস্থিরভাবে পাঠ করতে সেভাবে করো, তোমার শেষ আয়াতের জায়গায় হবে তোমার অবস্থান। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৬৪)
প্রতিদিন অন্ততঃ একটি করে আয়াত মুখস্থ করার অভ্যাস মানুষকে ফেরদাউসের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
৫. প্রতিদিন তিনবার প্রার্থনা করা: এটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি চমৎকার আমল।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তিনবার বেহেশত প্রার্থনা করে, বেহেশত তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলে, ‘হে আল্লাহ, তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাও।’ আর যে ব্যক্তি তিনবার দোজখের আগুন থেকে আশ্রয় চায়, দোজখ বলে, ‘হে আল্লাহ, তাকে আগুন থেকে রক্ষা করো’। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫৭২)
একটি দোয়া
প্রতিদিন নিজের মোনাজাতে একটি দোয়া মুখে উচ্চারণ করার অভ্যাস করা যায়।
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল বেহেশতুল ফেরদাউসাল আলা বিগায়রি হিসাব, ওয়া ক্বিনা আজাবান নার’।
অর্থ: হে আল্লাহ, হিসাব ছাড়াই আমাকে সর্বোচ্চ বেহেশত ফেরদাউস দান করো এবং দোজখের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।