প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন হয়? ইসলাম যা বলে

ছবি: পেক্সেলস

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল মানুষের মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই দেখা দেয়—ইসলাম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে ঠিক কীভাবে দেখে?

পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক সামনে আসে।

পরীক্ষা ও সতর্কবার্তা

ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব জীবন মূলত একধরনের পরীক্ষা। মানুষকে কখনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে, আবার কখনো কঠিন বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। বন্যা, ঝড় কিংবা ভূমিকম্পের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা একজন মুমিনের ধৈর্য, ইমান ও আল্লাহর প্রতি আস্থার পরীক্ষা।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয় ও ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

যখন মানুষ নিজের সামরিক শক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে, তখন প্রকৃতির একটি ছোট আঘাতও তাকে তার চরম সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। 

কোরআনে এসব ঘটনাকে মানব–মনস্তত্ত্বের জন্য আল্লাহর বিশেষ সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘আর আমরা নিদর্শনসমূহ প্রেরণ করি শুধু ভীতি প্রদর্শনের জন্য।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৫৯) 

অর্থাৎ দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সে সর্বশক্তিমান নয়; বরং তাকে তার স্রষ্টার দিকেই ফিরে যেতে হবে।

মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।
সুরা রুম, আয়াত: ৪১
আরও পড়ুন

পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব

পবিত্র কোরআন মানুষের হাতের কামাই ও সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে কিছু জাগতিক বিপর্যয়ের গভীর সম্পর্কও উল্লেখ করেছে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১) 

এই আয়াতের আলোকে সমাজতাত্ত্বিক আলেমরা বলেন, মানুষের অন্যায়, সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি ও নৈতিক পতন সমাজে বিভিন্ন মানবিক সংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

আজকের বিশ্বে অনেক দুর্যোগের পেছনে মানুষের পরিবেশ–বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড সরাসরি ভূমিকা রাখছে। নির্বিচারে বন উজাড়, নদী দখল, যত্রতত্র পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করছে।

কোরআনে আল্লাহ–তাআলা স্পষ্ট নিষেধ করে বলেছেন, ‘পৃথিবীকে সংশোধনের পর তোমরা তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৫৬)

এ কারণে পরিবেশ সংরক্ষণ করা শুধু একজন নাগরিকের সাধারণ দায়িত্বই নয়; এটি ইসলামের অন্যতম বড় সামষ্টিক ইবাদতও বটে।

কোরআন ও হাদিসে অতীতের কিছু অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর শাস্তি হিসেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬৪)

তবে বর্তমান যুগের কোনো নির্দিষ্ট বন্যা, ভূমিকম্প বা ঝড়কে আল্লাহর ‘শাস্তি’ বলে নিশ্চিত ঘোষণা করার কোনো অধিকার বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মানুষের নেই। 

একজন মুমিনের জন্য এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের অবস্থার সংশোধন করা।

দুর্যোগে নিহতদের জন্য সুসংবাদ

ইসলাম প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শুধু ধৈর্যের শিক্ষাই দেয়নি; বরং আকস্মিক বিপর্যয়ে নিহতদের জন্য বিশেষ পারলৌকিক মর্যাদার কথাও ঘোষণা করেছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারি বা প্লেগে মৃত ব্যক্তি, পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮২৯)

আরও পড়ুন
তকদিরে বিশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। নিরাপদ ঘরবাড়ি নির্মাণ, আগাম সতর্কব্যবস্থা এবং টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরি।

এই হাদিস প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহত মানুষের শোকার্ত পরিবারকে এক গভীর সান্ত্বনা ও আশার বার্তা দেয়।

দুর্যোগের তীব্র আশঙ্কায় মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

প্রবল ও ক্ষতিকর বৃষ্টি হলে তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমাদের চারপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়; পাহাড়, টিলা, উপত্যকা ও বৃক্ষরাজির ওপর বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৩) 

তাই দুর্যোগের সময় দোয়া, ইস্তিগফার ও তওবা মুমিনের প্রধান আত্মিক আমল।

প্রস্তুতি ও মানবিক তৎপরতা

ইসলাম তকদিরে বিশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। নিরাপদ ঘরবাড়ি নির্মাণ, আগাম সতর্কব্যবস্থা এবং দুর্যোগপূর্ব টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরি।

মহানবী (সা.) তাওয়াক্কুলের প্রকৃত স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাস্তব উপায় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আগে তোমার উটটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় ইসলামি দায়িত্ব হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুর্গতদের খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, আশ্রয় ও পুনর্বাসনে আর্থিক সহযোগিতা করা শুধু একটি মানবিক কাজই নয়; এটি মহান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় আমল। 

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯) 

দুর্যোগের সময় মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে আসাই ইসলামের প্রকৃত মানবিক চেতনার সামাজিক প্রকাশ।

  • সাব্বির খান আযহারী : শায়খুল হাদিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া, ঢাকা

আরও পড়ুন