পরকালে শয়তান যেভাবে দায়মুক্তি ঘোষণা করবে

ছবি: এআই / প্রথম আলো

মানুষ ভুল করে অনেক সময় নিজের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। ‘ও আমাকে প্ররোচিত করেছে’, ‘বন্ধুরা না বললে আমি করতাম না’, ‘পরিস্থিতিই আমাকে বাধ্য করেছে’—এমন অনেক অজুহাত আমাদের পরিচিত। কিন্তু আল্লাহর আদালতে এসব অজুহাত কতটা কাজে আসবে?

অপরাধীদের দাবি 

কেয়ামতের দিন মানুষকে যখন হিসাবের মুখোমুখি করা হবে, তখন অপরাধীরা শয়তানকে দায়ী করতে থাকবে। বলবে, শয়তানই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। কিন্তু সেদিন শয়তানও চুপ থাকবে না।

সে নিজের দায় অস্বীকার করে বলবে, সে কাউকে জোর করেনি; শুধু ডেকেছে, আর মানুষ তার ডাকে সাড়া দিয়েছে। কোরআন সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

শয়তানের ভাষ্য 

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না; আমি শুধু তোমাদের আল্লাহর অবাধ্যতা করার জন্য ডেকেছি, আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ। 

সুতরাং এখন আমাকে দোষারোপ করো না, বরং নিজেদেরই দোষারোপ কর। না তোমাদের বিপদ মুক্তিতে আমি তোমাদের কোনো সাহায্য করতে পারব আর না আমার বিপদ মুক্তিতে তোমরা আমার কোনো সাহায্য করতে পারবে। এর আগে তোমরা যে আমাকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করেছ (আজ) আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম। যারা এ সীমালংঘন করেছ আজ তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২২)

আরও পড়ুন

কেয়ামতের সেই দৃশ্যটি কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। মানুষ তখন বুঝতে পারবে, যাকে অনুসরণ করে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল, সেই শয়তানও আজ তার পাশে নেই। তাই সময় থাকতেই শত্রুকে চিনতে হবে।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)

সে শুধু প্ররোচনা দেয়

শয়তান মানুষের বড় শত্রু। সে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেয় এবং গুনাহের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। তবে তার ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সে কুমন্ত্রণা দিতে পারে, কিন্তু জোর করে পাপ করাতে পারে না। সে একটি পথ দেখায়; সেই পথে হাঁটবে কি না, তা মানুষকেই ঠিক করতে হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে এবং তাদের প্রতিপালক ওপর ভরসা করে, তাদের ওপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৯)

পাপকে সুশোভিত করে দেখায়

শয়তানের একটি বড় কৌশল হলো—পাপকে মানুষের কাছে অকর্ষণীয় সুন্দর করে তোলা।গিবতকে সে ‘সত্য কথা’ হিসেবে হাজির করে, অহংকারকে ‘আত্মসম্মান’ হিসাবে দেখায়। 

কখনো বলে, ‘একবার করলে কী হবে?’ কখনো বলে, ‘সবাই তো করছে।’ কখনো আবার বোঝায়, ‘সময় হলে তওবা করে নিও।’

এভাবেই পাপ ধীরে ধীরে মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, শয়তান মানুষের কাছে তাদের কাজকে শোভন করে তোলে। (সুরা আনফাল, আয়াত: ৪৮)

আরও পড়ুন

পরে তওবা করব, এটাও ধোঁকা 

শয়তান মানুষকে শুধু পাপের দিকে টানে না, তওবা থেকেও দূরে রাখে। সে বলে, ‘এখন তো বয়স আছে।’ ‘আরেকটু জীবন উপভোগ করো।’ ‘পরে নামাজ শুরু করবে।’ ‘পরে ভালো হয়ে যাবে।’ কিন্তু মানুষের জীবনে সেই ‘পরে’ আসবে কি না, কেউ জানে না।

আবার কেউ গুনাহ করে ফেললে শয়তান তাকে হতাশ করে। মনে করায়, ‘তুমি তো অনেক পাপ করেছ, তোমার আর ক্ষমা নেই।’

এটিও তার বড় প্রতারণা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

প্রতারণাই তার প্রতিশ্রুতি 

দুনিয়ায় শয়তান মানুষকে অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখায়। দুনিয়াটাকে সহজ থেকে সহজতর করে হাজির করে। সবই তার প্রতিশ্রুতির নামে প্রতারণা।

আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তাদের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের মনে আশা জাগায়; কিন্তু শয়তানের প্রতিশ্রুতি তো প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১২০)

দায় তাকেই নিতে হবে

কেয়ামতের দিন শয়তান নিজের দায়মুক্তি ঘোষণা করবে। কিন্তু মানুষ নিজের আমল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শয়তান যতই ডাকুক, আমি তার ডাকে সাড়া দেব না।

মনে রাখতে হবে, আমার হিসাব আমাকেই দিতে হবে। নিজের কাজের দায় অন্যেরর ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।’ (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩৮)

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর

আরও পড়ুন