আল্লাহকে ভালোবাসব না ভয় করব

ছবি: পেক্সেলস

একজন মুমিনের অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ইমানের দাবি। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে, আল্লাহর প্রতি তাদের প্রেম প্রগাঢ়।’ (সুরা বাকারা: ১৬৫)

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অংশ হিসেবেই তাঁর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপারে আশাবাদী হতে হবে। আবার তাঁর অসন্তুষ্টি, ভালোবাসা হারানো ও শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকতে হবে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ একই সঙ্গে তাঁর রহমত ও ক্ষমার জন্য আশাবাদী হতে বলেছেন, আবার তাঁকে ভয় করারও নির্দেশ দিয়েছেন।

কোরআনে আল্লাহ তাঁর উত্তম বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত।’ (সুরা আম্বিয়া: ৯০)

কোরআনে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হতে নিষেধ করে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

আবার তাঁকে ভয় করার অপরিহার্যতা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৫)

আরও পড়ুন
ভালোবাসা হলো তাঁর মাথা, আশা ও ভয় তাঁর দুই ডানা। মাথা ও দুটি ডানা যথাযথভাবে থাকলেই পাখি উড়তে পারে। মাথা কেটে ফেলা হলে পাখি মারা যায়।

আরেক আয়াতে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে? নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউ নির্ভয় হতে পারে না।’ (সুরা আ’রাফ: ৯৯)

সুতরাং আল্লাহর প্রতি প্রেম, তাঁর রহমতের আশা ও তাঁর শাস্তির ভয়ের মিলিতভাবেই থাকতে হবে মুমিনের অন্তরে। তাঁর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলে চলবে না, আবার তাঁর শাস্তির ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গেলেও চলবে না।

আল্লাহর মহত্ত্ব ও তাঁর অসীম ক্ষমতার কিছুটা অনুধাবন করতে পারলেও তাঁর ব্যাপারে অন্তরে ভয় জাগতে বাধ্য।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তার হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরিক করে তিনি তার অনেক ঊর্ধ্বে।’ (সুরা জুমার: ৬৭)

আল্লাহর ব্যাপারে মুমিনের অন্তরের ভালোবাসা, আশা ও ভয়ের মিলিত অবস্থার ব্যাপারে ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহ.) বলেন, আল্লাহর দিকে অন্তরের যাত্রার তুলনা করা যায় একটা পাখির উড়ে যাওয়ার সঙ্গে।

ভালোবাসা হলো তাঁর মাথা, আশা ও ভয় তাঁর দুই ডানা। মাথা ও দুটি ডানা যথাযথভাবে থাকলেই পাখি উড়তে পারে। মাথা কেটে ফেলা হলে পাখি মারা যায়। কোনো একটি ডানা ভেঙে গেলে পাখি আর উড়তে পারে না, যেকোনো শিকারির সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। (মাজমুউল ফাতাওয়া)

আরও পড়ুন
তারা যাদের ডাকে, তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে কে কত নিকটতর হতে পারে, তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার রবের শাস্তি ভয়াবহ।
কোরআন, সুরা ইসরা, আয়াত: ৫৭

আল্লাহর ভয় মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখে, তার অপরাধপ্রবণ সত্তাকে সংযত রাখে, আর তাঁর রহমতের আশা থেকেই মানুষ অনেক অপরাধের পরও তওবা করে, বেশি বেশি নেক আমল করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে।

তাঁর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় হারিয়ে গেলে মানুষ অপরাধপ্রবণ ও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, আশা হারিয়ে গেলে তওবা ও ইবাদতের উৎসাহও হারিয়ে যাবে।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ি মাকহুল আশ-শামির এ কথা খুব প্রসিদ্ধ, ‘যে আল্লাহর ইবাদত করে শুধু ভালোবাসা থেকে সে ‘জিন্দিক’ (মোনাফেকের চেয়েও খারাপ মুসলিম), যে আল্লাহর ইবাদত করে শুধু ভয় থেকে সে খারেজি, যে আল্লাহর ইবাদত করে শুধু আশা থেকে সে মুরজিয়া, আর যে আল্লাহর ইবাদত করে ভালোবাসা, আশা ও ভয় থেকে সে প্রকৃত মুমিন।’ (ইয়াহয়াউ উলুমিদ-দিন)

আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সম্পর্কে বলেন, ‘তারা যাদের ডাকে, তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে কে কত নিকটতর হতে পারে, তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার রবের শাস্তি ভয়াবহ।’ (সুরা ইসরা: ৫৭)

‘আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়’ সন্ধান করা হয় আল্লাহর প্রতি প্রেম, ভালোবাসা এবং তাঁর নৈকট্য লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই। এরপরই আল্লাহ ‘তাঁর রহমত পাওয়ার আশা’ এবং ‘তাঁর শাস্তিকে ভয়’ করার কথা বলেছেন। এটাই তাঁর প্রিয় বান্দাদের পথ।

আল্লাহ আমাদের তাঁর প্রিয় বান্দাদের পথে চলার তওফিক দিন। আমাদের অন্তরে তাঁর ভালোবাসা দান করুন, তাঁর রহমতের প্রত্যাশা ও শাস্তির ভয় দান করুন।

ওমর ফারুক ফেরদৌস : আলেম ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন