শয়তান যেভাবে দাম্পত্য জীবনে অশান্তির সূচনা করে

ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের ‘পোশাক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেহেতু এই পবিত্র বন্ধন আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয়, তাই শয়তানের (ইবলিস) কাছে এটি সবচেয়ে ঘৃণিত।

শয়তানের প্রধান লক্ষ্যই হলো যেকোনো উপায়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে একটি পরিবার ভেঙে দেওয়া। দাম্পত্য জীবনে শয়তান যেসব সুকৌশলে অশান্তির সূচনা করে, তা আলোচনা করা হলো।

ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে এবং মানুষের মাঝে ফিতনা সৃষ্টির জন্য তার বাহিনীকে পাঠায়... তাদের মধ্যে একজন এসে বলে, আমি অমুক স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি; তখন ইবলিস তাকে বুকে টেনে নেয় এবং বলে, তুমিই সবচেয়ে ভালো কাজ করেছ।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১৩

বিয়েবিচ্ছেদে শয়তানের সর্বোচ্চ আনন্দ

শয়তানের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ বা তালাক ঘটাতে পারা। মহানবী (সা.) একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে এবং মানুষের মাঝে ফিতনা সৃষ্টির জন্য তার বাহিনীকে পাঠায়... তাদের মধ্যে একজন এসে বলে, আমি অমুক স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি; তখন ইবলিস তাকে বুকে টেনে নেয় এবং বলে, তুমিই সবচেয়ে ভালো কাজ করেছ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১৩)

অর্থাৎ, চুরি বা পরকীয়ার চেয়েও পরিবার ভাঙার কারিগরকে শয়তান বেশি পুরস্কৃত করে।

আরও পড়ুন

ছোটখাটো ভুলকে বড় করে দেখানো

দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রী কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। শয়তান অত্যন্ত সুকৌশলে দুজনের ইতিবাচক গুণগুলোকে ভুলিয়ে দিয়ে শুধু ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে বড় করে মনের পর্দায় ভাসিয়ে তোলে। ফলে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা হারিয়ে যায়।

এই ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন স্বামী যেন তার মুমিন স্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে; কারণ স্ত্রীর একটি স্বভাব অপছন্দ হলেও অন্য একটি স্বভাব তার কাছে পছন্দনীয় হতে পারে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)

শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করতে পারে। সে স্বামী বা স্ত্রীর মনে একে অপরের চরিত্র বা বিশ্বস্ততা নিয়ে অমূলক সন্দেহের বীজ বুনে দেয়।

অহেতুক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বীজ বপন

দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। হাদিসের ভাষ্যমতে, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করতে পারে। সে স্বামী বা স্ত্রীর মনে একে অপরের চরিত্র বা বিশ্বস্ততা নিয়ে অমূলক সন্দেহের বীজ বুনে দেয়।

পবিত্র কোরআনে জাদুটোনা বা শয়তানি প্ররোচনার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হিসেবে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভেদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০২)

ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, শয়তান ও জাদুকরেরা স্বামী-স্ত্রীর মনে একে অপরের প্রতি কাল্পনিক কুৎসিত রূপ বা বিদ্বেষ তৈরি করে দেয়, যাতে তারা একে অপরকে সন্দেহ করে এবং তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/১৪৪, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

আরও পড়ুন

রাগের সময় উসকানি ও তালাকের প্ররোচনা

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সাধারণ মান-অভিমান বা ঝগড়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শয়তান এই রাগের সময় ইন্ধন জোগায় এবং মানুষের হিতাহিত জ্ঞান শূন্য করে দেয়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর শয়তান আগুনের তৈরি...।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)

রাগের বশবর্তী হয়েই স্বামী অনেক সময় ‘তালাক’-এর মতো জঘন্য শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেন। রাগের চরম মুহূর্তে শয়তান মানুষের বিবেককে ঢেকে দেয় এবং তার মুখ দিয়ে এমন কথা বের করে আনে, যা মূলত একটি সংসার ধ্বংসের চূড়ান্ত হাতিয়ার। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৩/২৪৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

শয়তান স্বামী-স্ত্রীকে তাদের একে অপরের প্রতি শারীরিক ও মানসিক অধিকার পূরণে উদাসীন করে তোলে। সে বাইরের বেগানা মানুষের সৌন্দর্যকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে স্বামী বা স্ত্রীর মনে ফিতনা সৃষ্টি করে।

পরস্পরের অধিকার পূরণে গাফিলতি

শয়তান স্বামী-স্ত্রীকে তাদের একে অপরের প্রতি শারীরিক ও মানসিক অধিকার পূরণে উদাসীন করে তোলে। সে বাইরের গায়রে মাহরাম (বেগানা) মানুষের সৌন্দর্যকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে স্বামী বা স্ত্রীর মনে ফিতনা সৃষ্টি করে।

এই শয়তানি মন্ত্রণা থেকে বাঁচার পথ দেখিয়ে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যদি কোনো ব্যক্তি বাইরের কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে সে যেন দ্রুত তার স্ত্রীর কাছে ফিরে যায়; কারণ এতে তার মনের কুমন্ত্রণা দূর হয়ে যাবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০৩)

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের অধিকার ও অন্তরঙ্গতা রক্ষা করা ওয়াজিব, যাতে তারা শয়তানের প্ররোচনা ও বাইরের কোনো ফিতনা থেকে নিজেদের চরিত্রকে পবিত্র রাখতে পারে। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ১/৩২৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)

দাম্পত্য জীবনে এই শয়তানি প্ররোচনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ক্ষমা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা এবং যেকোনো কলহ নিজেদের মাঝে সুন্দরভাবে মিটিয়ে ফেলার অভ্যাস করা আবশ্যক।

রাগ ও সন্দেহের মুহূর্তে ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়ে আল্লাহর আশ্রয় নেওয়াই হলো দাম্পত্য সুরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আরও পড়ুন