আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হয়

ছবি: পেক্সেলস

মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকবে আবার তাঁর ভয়ও থাকবে। ভালোবাসা মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয় আর ভয় তাকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখে। এই দুটির কোনো একটিকে বাদ দিলে ইমানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারা তাদের রবকে ভয় ও আশার সঙ্গে ডাকে।’ (সুরা আস-সাজদা, আয়াত: ১৬)

এখানে ভয় ও আশাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। মুমিন আল্লাহকে ভয় করে। কারণ, তিনি সর্বশক্তিমান এবং তাঁর অবাধ্যতার পরিণতি ভয়াবহ। আবার সে আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁর রহমতের আশা রাখে। কারণ, তিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।

আল্লাহর ভয় মানে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকা নয়। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, তিনি আমার কথা ও কাজ জানেন এবং তাঁর অবাধ্যতার জবাবদিহি আমাকে করতে হবে—এ অনুভূতি অন্তরে জীবিত রাখা। এ ভয় মানুষকে গোপনে গুনাহ করা থেকে বিরত রাখে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত: ৪৬)

তারা আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকে।
সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৯০
আরও পড়ুন

অন্যদিকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা মানুষকে শুধু শাস্তির ভয় থেকে ইবাদত করার স্তর পেরিয়ে নিয়ে যায়। সে নামাজ পড়ে শুধু জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য নয়; সে নামাজ পড়ে রবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য।

সে গুনাহ ছাড়ে শুধু শাস্তির ভয়ে নয়; সে গুনাহ ছাড়ে, কারণ যে আল্লাহকে সে ভালোবাসে, তাঁর অবাধ্য হতে তার অন্তর সংকুচিত হয়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে, তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৫)

তবে ভালোবাসার নামে আল্লাহর ভয় হারিয়ে ফেলা যেমন ভুল, তেমনি ভয়কে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকেই নিরাশ হয়ে যায়, তা–ও ভুল।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৬)

এ কারণেই মুমিনের হৃদয়ে ভয় ও আশা পাশাপাশি থাকে। সে গুনাহ করলে ভয় পায়, কিন্তু তওবার দরজা বন্ধ মনে করে না। সে আল্লাহর রহমতের আশা করে, কিন্তু সেই আশাকে গুনাহ করার অজুহাত বানায় না।

কোরআনে আল্লাহ–তাআলা তাঁর বান্দাদের বর্ণনা করে বলেন, ‘তারা আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৯০)

আরও পড়ুন
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের পরিপূর্ণতা হলো এমন এক হৃদয় তৈরি করা, যে হৃদয় আল্লাহকে ভালোবাসে, তাঁর অসন্তুষ্টিকে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা রাখে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ভালোবাসা মানুষকে কাছে আনে, ভয় তাকে সীমারেখা অতিক্রম করতে দেয় না আর আশা তাকে বারবার ফিরে আসার সাহস দেয়। এই তিনটি অনুভূতি মিলেই মুমিনের আল্লাহর সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হয়।

শুধু ভয় থাকলে মানুষ কখনো কখনো হতাশ হয়ে যেতে পারে। শুধু আশা থাকলে সে নিজের ভুলকে হালকা করে দেখতে পারে। আর শুধু ভালোবাসার দাবি থাকলে আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই মুমিনের হৃদয়ে থাকতে হয়—ভালোবাসা, ভয় ও আশা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি মুমিন জানত আল্লাহর কাছে কী শাস্তি রয়েছে, তাহলে কেউ তাঁর জান্নাতের আশা করত না। আর কাফির যদি জানত আল্লাহর কাছে কী রহমত রয়েছে, তাহলে কেউ তাঁর জান্নাত থেকে নিরাশ হতো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫৫)

তাই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের পরিপূর্ণতা হলো এমন এক হৃদয় তৈরি করা, যে হৃদয় আল্লাহকে ভালোবাসে, তাঁর অসন্তুষ্টিকে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা রাখে।

ভালোবাসা তাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, ভয় তাকে তাঁর অবাধ্যতা থেকে রক্ষা করে আর আশা তাকে পড়ে যাওয়ার পরও আবার আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।

আরও পড়ুন