একজন মুমিন যেভাবে সময় কাজে লাগান

ছবি: ফ্রিপিক

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী? অনেকেই হয়তো বলবেন অর্থ, বৈভব কিংবা ক্ষমতা। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, মানুষের জীবনের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ হলো সময়। কারণ, হারিয়ে যাওয়া অর্থ বা প্রতিপত্তি আবার অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু জীবন থেকে চলে যাওয়া একটি একক মুহূর্তও আর কখনোই ফিরে আসে না।

এ জন্যই সময় মানুষের প্রকৃত জীবন-পুঁজি। যে ব্যক্তি সময়ের মূল্য বোঝে এবং তা যথাযথভাবে কাজে লাগায়, সে দুনিয়াতেও সফল হয় এবং আখেরাতেও উত্তম প্রতিদান লাভ করে।

কোরআনে সময়ের শপথ

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বিভিন্ন জায়গায় সময়ের বিভিন্ন খণ্ডের শপথ করেছেন; কখনো ফজরের, কখনো আসরের, আবার কখনো রাতের। ইসলামের নিয়মানুযায়ী, আল্লাহর কোনো সৃষ্টির শপথ করার অর্থই হলো সেই বিষয়ের বিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য প্রমাণ করা।

সময়ের শপথের মাধ্যমে তিনি মূলত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—জীবনের প্রকৃত সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে মানুষ কীভাবে তার সময়টুকু ব্যয় করছে সেটির ওপর।

মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ব্যতীত, যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর, আয়াত: ১–৩)

দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ চরম ধোঁকা ও লোকসানের মধ্যে রয়েছে—সুস্থতা ও অবসর।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২
আরও পড়ুন

সময় আল্লাহর পবিত্র আমানত

আল্লাহ–তাআলা মানুষকে এক সুনির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই পার্থিব জীবন অনন্ত নয়; একদিন এর অবসান ঘটবেই। তাই প্রতিটি মুহূর্তই এক একটি পবিত্র আমানত, যার নিখুঁত হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে।

মহানবী (সা.) জানিয়েছেন, কেয়ামতের দিন কোনো বান্দা তার চরণ দুটি এক কদমও নড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন কীভাবে কাটিয়েছে এবং যৌবনের শক্তি কোথায় ব্যয় করেছে—সে সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রশ্ন করা হবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)

এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে সময়ের প্রতি চূড়ান্ত দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে শেখায়। সে জানে, প্রতিটি অলস সেকেন্ডও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অপূর্ব সুযোগের অপচয়।

অলসতাই বড় ক্ষতি

অনেকেই মনে করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো অর্থ হারানো, ব্যবসায় লোকসান হওয়া বা কোনো বৈষয়িক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এমন একটি দিন পার করে দেওয়া, যেদিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বা মানবতার কল্যাণে কোনো আমল করা হয়নি।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ চরম ধোঁকা ও লোকসানের মধ্যে রয়েছে—সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)

একবার ভেবে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিদিন কত সময় আমরা এমন অনর্থক কাজে ব্যয় করি, যার কোনো সুফল না আছে দুনিয়াতে, না আখেরাতে।

অথচ এই ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের সামান্য অংশও যদি কোরআন অধ্যয়ন, কোনো দরকারি জ্ঞানার্জন, আত্মশুদ্ধি কিংবা মানুষের সেবায় ব্যয় করা হতো, তবে তা আমাদের পরকালীন জীবনের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী ও মূল্যবান বিনিয়োগ হয়ে থাকত।

আরও পড়ুন
দরকারি জ্ঞান অর্জন, মা-বাবা, পরিবার ও আত্মীয়দের হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার।

অনেকেই ভাবেন, সামনে তো অনেক সময় পড়ে আছে; পরে ইবাদত করব, পরে ভালো কাজ শুরু করব। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত ‘পরে’ শব্দটা অনেকের জীবনেই আর কোনোদিন আসে না।

তাই কোনো ভালো কাজই বিলম্ব করা বা আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।

সময়কে অর্থবহ করার উপায়

জীবনকে অর্থবহ করতে হলে নিজেকে অবিরাম এমন কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে, যা দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা এবং প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত ও এর মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টা করার মাধ্যমে দিনটিকে শৃঙ্খলায় আনা যায়।

সেই সঙ্গে দরকারি জ্ঞান অর্জন, মা-বাবা, পরিবার ও আত্মীয়দের হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অযথা আড্ডা, অনর্থক বিতর্ক ও সোশ্যাল মিডিয়ার অর্থহীন স্ক্রলিংয়ে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা এবং প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা করা।

শেষকথা, সময় আল্লাহ–তাআলার দেওয়া সবচেয়ে বড় ও অমূল্য নেয়ামত। এই সময়টুকুই নির্ধারণ করে মানুষের চরিত্র ও আখেরাতের অনন্ত ভবিষ্যৎ। প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থহীন কাজে নষ্ট না করে ইবাদত, সৎকর্ম, পরিবার ও মানবকল্যাণে ব্যয় করাই একজন প্রকৃত মুমিনের মূল জীবনদর্শন।

  • রায়হান আল ইমরান : গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন