খাদ্য নষ্ট করা ইসলামে একটি গুরুতর অপরাধ

ছবি: পেক্সেলস

মানবজীবনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অন্যতম প্রধান উপাদান হলো খাদ্য ও সম্পদ। ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদুশ শারইয়াহ’র অন্যতম হলো সম্পদ রক্ষা করা।

অথচ বর্তমান বিশ্বে একদিকে যখন লাখো মানুষ খাদ্যের অভাবে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে তখন উদ্বৃত্ত পণ্য বাজারে দাম ধরে রাখা বা রপ্তানি করতে না পারার অজুহাতে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।

কৃষিপণ্য রাস্তায় ঢেলে দেওয়া বা ডাস্টবিনে খাবার ছুড়ে ফেলার এই প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং এটি একটি চরম নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ।

সম্পদ রক্ষা: শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমামগণ একমত যে, শরিয়ত পাঁচটি বিষয় রক্ষার জন্য প্রেরিত হয়েছে। এগুলো হলো: দীন (ধর্ম), নফস (জীবন), আকল (বুদ্ধিবৃত্তি), নাসল (বংশধারা) এবং মাল (সম্পদ)।

ইমাম গাজালি এ প্রসঙ্গে বলেন, “সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে; আর তা হলো মানুষের ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ রক্ষা করা। যা কিছু এই পাঁচটি বিষয়কে নিশ্চিত করে তা-ই ‘মাসলাহাত’ বা জনকল্যাণ, আর যা এর হানি ঘটায় তা-ই ‘মাফাসাদাত’ বা বিপর্যয়।” (আল-মুসতাসফা মিন ইলমিল উসুল, ১/৪১৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)

একইভাবে ইমাম শাতিবি (রহ.)-ও সম্পদ রক্ষাকে ‘জরুরিয়াত’ বা অপরিহার্য স্তরের গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সম্পদ যদি সংরক্ষিত না থাকে, তবে পার্থিব শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাবে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। (আল-মুওয়াফাকাত, ২/৮-১০, দারু ইবনি আফফান, আল-খাবার, ১৯৯৭)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সম্পদকে মানুষের জীবন পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তা নির্বোধের মতো নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন।
আরও পড়ুন

অপচয় সম্পর্কে কোরআন

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সম্পদকে মানুষের জীবন পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তা নির্বোধের মতো নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা তোমাদের সম্পদ—যা আল্লাহ তোমাদের জীবনযাত্রার অবলম্বন করেছেন—তা নির্বোধদের হাতে অর্পণ করো না।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৫) 

সম্পদ নষ্ট করা বা অপচয় করার ভয়াবহতা সম্পর্কে কোরআনের বাণী অত্যন্ত কঠোর:

শয়তানের ভাই: আল্লাহ তাআলা বলেন, “আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দান করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৬-২৭)

আল্লাহর অপছন্দ: আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। তিনি বলেছেন, “তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয়: মুমিনের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, “আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের পন্থা হয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

হাদিসের ভাষ্য

হাদিসেও সম্পদ নষ্ট করাকে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় পছন্দ করেন এবং তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন। পছন্দ করেন যে—তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না; তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং বিচ্ছিন্ন হবে না; আর যাকে আল্লাহ তোমাদের দায়িত্বশীল করেছেন তার কল্যাণ কামনা করবে। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন—অপ্রয়োজনীয় কথা বলা (গিবত-শেকায়েত), অধিক হারে (অপ্রয়োজনীয়) প্রশ্ন করা এবং সম্পদ নষ্ট করা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭১৫)

আরও পড়ুন

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) বলেন, “সম্পদ নষ্ট করার অর্থ হলো, সঠিক খাতে ব্যয় না করা এবং ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। এর কারণ হলো এটি একটি বিপর্যয়, আর আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।” (শারহুন নাবাবি আলা সহিহি মুসলিম, ৪/৩৭৫-৩৭৭, মুআসসাসাতু কুরতুবা, কায়রো, ১৯৯৪)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, “আল্লাহ সম্পদকে মানুষের জীবন ও স্বার্থের ভিত্তি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এর অপচয় সেই স্বার্থ ও উদ্দেশ্যকেই নস্যাৎ করে দেয়।” (ফাতহুল বারি, ১০/৫০১, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

ফকিহদের মতে, নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ হলেও তা এভাবে ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই।

উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য বা খাদ্য নষ্ট করা

অনেক সময় কৃষক বা ব্যবসায়ীরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বা বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পণ্য রাস্তায় ফেলে দেয়। ফিকহ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘সাফাহ’ বা বোকামি এবং হারাম কাজ। ফকিহদের মতে, নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ হলেও তা এভাবে ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই।

যদি কোনো কারণে কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব না হয় বা বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া যায়, তবে তা নষ্ট না করে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়:

১. স্থানীয় বাজারে স্বল্পমূল্যে বিক্রি: লাভের পরিমাণ কমিয়ে বা কেবল নামমাত্র মূল্যে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তা ছেড়ে দেওয়া।

২. দান বা সদকা করা: যদি বিক্রি সম্ভব না হয়, তবে অভাবী মানুষ, এতিমখানা বা বৃদ্ধাশ্রমে সেগুলো দান করে দেওয়া। এতে আখেরাতে বিপুল সওয়াব অর্জিত হবে।

৩. প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার: যদি মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ার উপক্রম হয়, তবে তা গবাদি পশু বা পাখিকে খাইয়ে দেওয়া উচিত। কারণ কোনো প্রাণীর সেবা করা বা প্রাণীকে খাদ্য দেওয়ার মধ্যেও সওয়াব রয়েছে।

ইমাম নাসায়ি তাঁর সুনান গ্রন্থে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন এভাবে—‘শাসক কর্তৃক প্রজাদের সম্পদ নষ্ট করতে বাধা প্রদান’। সেখানে তিনি হজরত জাবের (রা.)-এর সূত্রে একটি বর্ণনা এনেছেন যে জনৈক ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার দাসকে আজাদ করে দিয়েছিল।

আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দাসটিকে বিক্রি করে দেন এবং প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সেই ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪৬৫০)

এর থেকে প্রমাণিত হয়, জনস্বার্থে ব্যক্তিগত সম্পদের অপব্যবহার রোধ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে।

আরও পড়ুন