অসুস্থতার সময় একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় আন্তরিক সহমর্মিতা, আশ্বাস ও সঠিক সেবা যত্ন। মহানবী (সা.) তাই শুধু রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজ জীবনে তা বাস্তবায়ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
অসুস্থ ইহুদি বালকের শুশ্রূষা
এক ইহুদি বালক নবীজির ব্যক্তিগত কাজে সহায়তা করত। একসময় সে অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজি (সা.) নিজে তাকে দেখতে তার বাড়িতে যান। তিনি বালকটির মাথার কাছে বসে স্নেহভরে বললেন, ‘তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।’
বালকটি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার পিতার দিকে তাকালে পিতা বললেন, ‘তুমি আবুল কাসিমের (নবীজির উপনাম) আনুগত্য করো।’ তখন বালকটি ইসলাম গ্রহণ করল। মহানবী (সা.) সেখান থেকে বের হয়ে আনন্দের সঙ্গে বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি আমার মাধ্যমে তাকে দোজখ থেকে রক্ষা করেছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৬)
যে ব্যক্তি কোনো অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, সে না ফেরা পর্যন্ত বেহেশতের ফলবাগানে বিচরণ করতে থাকে।
অসুস্থ বালকটি ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের হওয়া সত্ত্বেও নবীজি (সা.) তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তার শুশ্রূষায় উপস্থিত হয়েছিলেন। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে ইসলামের দৃষ্টিতে সেবা ও মানবিকতা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো সুসংহত সামাজিক দায়িত্ব।
রোগী দেখতে যাওয়া মুসলিমের অধিকার
ইসলাম রোগীর সেবাকে সামাজিক মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের ছয়টি অধিকার রয়েছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেগুলো কী?’
তিনি বললেন, ‘তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন সালাম দেবে, সে দাওয়াত দিলে কবুল করবে, পরামর্শ চাইলে ভালো পরামর্শ দেবে, হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে এবং মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৬২)
রোগী দেখার অসামান্য ফজিলত
রোগীকে দেখতে যাওয়া ও সেবা করার আত্মিক ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা.) অসাধারণ সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, সে না ফেরা পর্যন্ত বেহেশতের ফলবাগানে বিচরণ করতে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৮)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘কোনো মুসলিম যদি সকালে কোনো অসুস্থ রোগীকে দেখতে যায়, তবে সত্তর হাজার ফেরেশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমার দোয়া করতে থাকেন। আর সন্ধ্যায় গেলে ভোর পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য অনুকম্পার দোয়া করেন এবং জান্নাতে তার জন্য একটি ফলের বাগান প্রস্তুত করা হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩০৯৮)
নবীজি (সা.) কখনো রোগীকে দেখতে গিয়ে হতাশাজনক কথা বলতেন না, বরং রোগীর অন্তরে আল্লাহর রহমতের আশা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতেন। তিনি অসুস্থ ব্যক্তির পাশে বসে বলতেন, ‘লা বা’সা, তাহুরুন ইনশাআল্লাহ।
রোগীর মনোবল বৃদ্ধিতে দোয়া
নবীজি (সা.) কখনো রোগীকে দেখতে গিয়ে হতাশাজনক কথা বলতেন না, বরং রোগীর অন্তরে আল্লাহর রহমতের আশা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতেন। তিনি অসুস্থ ব্যক্তির পাশে বসে বলতেন, ‘লা বা’সা, তাহুরুন ইনশাআল্লাহ’ (কোনো চিন্তা নেই, ইনশা আল্লাহ এ অসুস্থতা তোমাকে পবিত্র করবে)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬১৬)
কষ্টপ্রাপ্ত রোগী যখন কারও মুখে এমন আশাব্যঞ্জক কথা শোনে, তখন তার মন থেকে অর্ধেক মানসিক চাপ দূর হয়ে যায়।
পাশাপাশি রোগীর দ্রুত সুস্থতার জন্য বিশেষ দোয়া করাও সুন্নত। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, ‘আসআলুল্লাহাল আজিমা, রাব্বাল আরশিল আজিমি, আন ইয়াশফিয়াকা’ (আমি মহান আল্লাহ, সুবিশাল আরশের রবের কাছে আপনার পূর্ণ সুস্থতা কামনা করছি)।’
মহানবী (সা.) বলেন, কোনো রোগীর মৃত্যুর সময় নির্ধারিত না হয়ে থাকলে এই দোয়া তাঁর পাশে সাতবার পাঠ করলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই আরোগ্য দান করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১০৬)
সামাজিক দূরত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতার এই যুগে নবীজি এই সেবাধর্মী ও মানবিক সুন্নতগুলোকে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা অত্যন্ত জরুরি।
রোগী দেখার আদব
রোগী দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নববি আদব ও শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি।
অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে রোগীকে ক্লান্ত না করা।
অসুস্থ ব্যক্তিকে বিরক্ত বা আতঙ্কিত করে এমন প্রশ্ন বা কথা না বলা।
নিরাশাজনক খবরের বদলে আল্লাহর রহমত ও আরোগ্যের আশা জাগানো।
রোগীর জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা ও স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়া।
সম্ভব হলে চিকিৎসায় আর্থিক বা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।
বর্তমান কর্মব্যস্ত ও নাগরিক জীবনে আমরা অনেক সময় অসুস্থ আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মীর সামান্য খোঁজ নেওয়ার ফুরসত পাই না। অথচ একটি ফোনকল কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক সাক্ষাৎ একজন অসুস্থ মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক দূরত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতার এই যুগে নবীজি এই সেবাধর্মী ও মানবিক সুন্নতগুলোকে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি একদিকে যেমন সওয়াব অর্জনের বড় মাধ্যম, অন্যদিকে সমাজের পারস্পরিক বন্ধন ও সৌহার্দ্যকে বহু গুণে সুদৃঢ় করে তুলবে।
নাহিদা সুলতানা : আলেমা ও প্রাবন্ধিক