ইতিহাস লেখার একটি পুরনো সমস্যা আছে। বড় বড় ঘটনা, যেমন যুদ্ধ, চুক্তি, কোনো নাটকীয় মোড়—এসবই সবার আগে চোখে পড়ে। কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে যে সাধারণ, নীরব দিনগুলো থাকে, মানুষের মনের ভেতরের যে ধীর পরিবর্তন হতে থাকে, সেগুলো প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।
মহানবীর জীবনী নিয়েও একই কথা বলা যায়। সাহাবি সাহল ইবনে আবু হাসমাহ, ইবনে শিহাব জুহরি, মুসা ইবনে উকবা, ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদি থেকে নিয়ে হাজার বছরে বিশ্বের খ্যাতিমান সিরাত বিশেষজ্ঞরা যে কাজ করেছেন, তার বেশিরভাগেই দেখা যায়, নবুয়তের পরের তেইশ বছরের বড় কয়েকটি ঘটনা এত বেশি জায়গা নিয়ে নিয়েছে যে রাসুলের তেষট্টি বছরের জীবন পাঠকের কাছে একটানা কোনো গল্পের বদলে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি মনে হয়।
আধুনিক সময়ে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত মহানবীর একাধিক জীবনীগ্রন্থ এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেই বিবেচনায় সিরাত (বানানভেদে সীরাত) গবেষক মুতাছিম বিল্লাহর লেখা এক নজরে সীরাত গ্রন্থকে বাংলাভাষায় লেখা নবীজীবনের একটি অনন্য সংযোজন বলা যায়। এখানে নবীজির জীবনকে একটি টানা ক্যানভাসে আঁকা দৃশ্যকল্পে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিটি বছরের ভেতরে আবার একই রকম ছত্রিশটি ভাগ আছে। সেই বছর নবীজি (সা.) কোথায় ছিলেন, কী খেতেন, কেমন পোশাক পরতেন, কার কার সঙ্গে সময় কাটাতেন, আর সব শেষে আছে, আজকের দুনিয়ায় সেই বছরের ঘটনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি।
বছর ধরে ধরে গোটা জীবন
বইয়ের মূল ধারণাটি অবশ্য সহজ—নবীজির তেষট্টি বছরের জীবনকে আলাদা আলাদা করে ধরা। সূচিপত্রে দেখা যায়, নবুয়তের আগের বছরগুলো ‘হিজরী পূর্ব’ হিসেবে গুণে প্রতিটি বছরের একটি নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন ‘সততা ও আস্থার বছর’, ‘আমানত বহনের বছর’, ‘কৌশল, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বছর’—এভাবে হিজরতের পর পর্যন্ত, এমনকি বিদায় হজ পেরিয়েও এগিয়ে গেছে। দেড় হাজার বছরের বাংলা সিরাত-সাহিত্যে এভাবে একটানা নবীজীবনকে সাজানোর কাজ এর আগে দেখা যায়নি।
প্রতিটি বছরের ভেতরে আবার একই রকম ছত্রিশটি ভাগ আছে। সেই বছর নবীজি (সা.) কোথায় ছিলেন, কী খেতেন, কেমন পোশাক পরতেন, কার কার সঙ্গে সময় কাটাতেন, প্রধান ঘটনা কী ছিল আর কেন হলো, তাঁর মনের অবস্থা কেমন ছিল, আর সব শেষে আজকের দুনিয়ায় সেই বছরের ঘটনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি।
ফলে মহানবীর মহাজীবন এখানে শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকে নি, বরং একজন মানুষের শৈশব, ব্যবসা, সংসার আর পরে নবুয়তের ভার বহনের গোটা যাত্রা যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখকের দাবি, এসব তথ্য জোগাড় করা হয়েছে সিরাতের ঊনষাটটটি মূল বই ঘেঁটে।
মলাট উল্টিয়ে দেখা যাক তাহলে
কথায় না বুঝিয়ে বইয়ের একটি অংশ ধরে দেখানো যাক। হিজরতের ঠিক আগের বছর, মানে ৫৩তম বছরকে বইয়ে বলা হয়েছে ‘কৌশল, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বছর’। অধ্যায় শুরু হয় সেই বছরের ঘটনা বলার মধ্য দিয়ে।
আকাবার শপথ, সাহাবি মুসআব ইবনে উমাইরকে মদিনায় পাঠানো, সা’দ ইবনে উবাদাহর বন্দী হওয়া ও মুক্তি, সাহাবিদের একে একে মদিনায় চলে যাওয়া—প্রতিটি তথ্যের পাশে কোন বই থেকে নেওয়া হয়েছে তার পৃষ্ঠা নম্বরও দেওয়া আছে।
এরপর একে একে আসে: নবীজির তখনকার বয়স আর অবস্থান দেখানো একটি ছোট নকশা; বছরের নাম কেন দেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা; তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা; সেই সময়ের পোশাকের বর্ণনা; কাছের মানুষদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়; মানসিক অবস্থার একটি লাইনচিত্র; নৈতিক গুণের তালিকা; কারণ আর তার ফল দেখানো একটি ছক; আগে করা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী কীভাবে সত্যি হলো তার বর্ণনা; সাহাবিদের ভূমিকার বিস্তারিত কথা; ওই বছর নাজিল হওয়া আয়াত ও তার শিক্ষা; অন্য গোত্রের সঙ্গে আলোচনার গল্প; জীবনে প্রয়োগের কথা; ধাপে ধাপে শিক্ষা; একটা মোজেজার (অলৌকিক ঘটনা) বর্ণনা; একটি ‘কেস স্টাডি’; আর সবশেষে ‘আজকের জন্য বার্তা’ নামে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর মতো একগুচ্ছ পরামর্শ।
একটিমাত্র বছরের পেছনে এত কিছু থাকা দেখে বোঝা যায়, পুরো বই তৈরি করতে কতখানি পরিশ্রম আর গোছানো পরিকল্পনা লেগেছে।
বয়স ধরে ধরে সাজানোর ব্যাপারটিও চমৎকার। পাঠক নিজের বর্তমান বয়সে দাঁড়িয়ে দেখতে পারেন, ঠিক এই বয়সে নবীজি (সা.) কী ধরনের অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
কেন এই বইটি আলাদা
বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটি সিরাতকে শুধু পুরনো গল্প করে রাখেনি, আজকের সমস্যার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আজকের মানুষ যখন নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায়, মানসিক চাপে বা একাকীত্বে ভোগে, তখন দেড় হাজার বছর আগের একটা জীবন কীভাবে পথ দেখাতে পারে তা খুব হাতেকলমে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
নবুয়তের আগের চল্লিশ বছরে নবীজি যেভাবে ‘হিলফুল ফুজুল’ গড়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, কাবা মেরামতের সময় গোত্রীয় ঝগড়া থামাতে যে বুদ্ধি দেখিয়েছিলেন, বা হেরা গুহায় একা বসে যে প্রশ্নগুলো ভাবতেন—এসব আজকের তরুণদের জন্যও অনেক ভাবনার খোরাক জোগায়।
বয়স ধরে ধরে সাজানোর ব্যাপারটিও চমৎকার। পাঠক নিজের বর্তমান বয়সে দাঁড়িয়ে দেখতে পারেন, ঠিক এই বয়সে নবীজি (সা.) কী ধরনের অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন, আর কীভাবে ধৈর্য ধরে রেখেছিলেন। এতে সিরাত আর শুধু দূরের কোনো স্মৃতি মনে হবে না, নিজের জীবনের কাছাকাছি লাগবে।
বইয়ের সঙ্গে থাকা ‘সীরাত জার্নি নোটবুক’-ও এই কাজে সহায়তা করবে নিশ্চিত, যেন পাঠক শুধু পড়েই থেমে না গিয়ে নিজের অনুভূতি আর শিক্ষা ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারেন। এতে পড়াটা নিষ্ক্রিয় না থেকে একটি সক্রিয় চর্চায় বদলে যাবে।
দেখতেও বইটি বেশ সুন্দর। রঙিন ছক, ছোট ছোট নকশা আর বাক্সে ভাগ করা তথ্য—এসব দেখতে সহজ আর মনে থাকার মতো। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের কাছে এটি সাধারণ পাঠ্য-নির্ভর বইয়ের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগতে পারে। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, ভূগোল, মনোবিজ্ঞান, সমাজ আর নেতৃত্ব নিয়েও কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে, যা বইকে একরৈখিক থাকতে দেয়নি।
যেখানে কিছুটা খটকা লাগে
তবে এই যে সব কিছুকে ছক আর নকশায় বেঁধে ফেলার চেষ্টা, এর একটু ঝুঁকিও আছে। সিরাত সাহিত্যের যে গাম্ভীর্য আর ভাষার সৌন্দর্য, তা মাঝে মাঝে এত তথ্য আর ছকের চাপে কিছুটা যান্ত্রিক মনে হয়। সিরাতের অনেক ঘটনার সাল-তারিখ নিয়েও আলেমদের মতভেদ আছে।
একটি নির্দিষ্ট টাইমলাইনে সব কিছু বসাতে গেলে কিছু জায়গায় সরলীকরণ হয়ে যাওয়াটা প্রায় অনিবার্য। যেমন, একটি বছরকে একটি ‘নাম’ দিয়ে ফেলার কারণে পড়তে সহজ লাগে ঠিকই, কিন্তু আসলে সেই বছরে যে অনেক জটিল, বহুমুখী ঘটনা ঘটেছিল—তা খানিকটা চাপা পড়ে যেতে পারে।
হ্যাঁ, এই দুর্বলতার কথাটি লেখকও নিশ্চয় ধরতে পেরেছেন। তাই শুরুতে একটি সতর্কীকরণ নোট রাখা হয়েছে, “বয়সভিত্তিক বিন্যাস পাঠকের অনুধাবনের সুবিধার জন্য করা হয়েছে, নির্দিষ্ট বছরের সরাসরি বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করা উদ্দেশ্য নয়।”
বইটির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটি নিজেকে ধ্রুপদী সিরাত গ্রন্থের বিকল্প বলে দাবি করে নি। বরং এটা সেই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারে ঢোকার একটা সহজ দরজা হতে চেয়েছে।
আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে, তা হলো, ‘আজকের জন্য বার্তা’ অংশে ব্যবসা আর ‘স্টার্টআপ’ জগতের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বেশ খোলাখুলি, যেমন ‘স্কিন ইন দ্য গেম’, ‘স্টিলথ মোড’, ‘পিভট করা’ ইত্যাদি। এতে অনেক তরুণ পাঠকের কাছে বার্তাগুলো একদম নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যাবে এবং ভালোও লাগবে বটে, কিন্তু কিছু পাঠকের কাছে মনে হতে পারে, নবীজীবনের গভীর শিক্ষাকে একটু বেশিই ব্যবস্থাপনা-পরামর্শের ভাষায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
তা ছাড়া ‘প্রথম’ বা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার যেসব দাবি প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়ে এসেছে, সেগুলো নিয়ে পাঠকের নিজের মতো যাচাই করে নেওয়াই ভালো। একটি বই নিজেকে নিয়ে যা বলে আর বাইরে থেকে সেটি যাচাই হওয়া, এই দুটো এক জিনিস নয়। বিশেষ করে কিছু মুদ্রণ প্রমাদের কথা তো বলাই যায়, যদিও তা প্রথম সংস্করণের পক্ষে অতটা দূষণীয় নয়।
শেষ কথা
সব সত্ত্বেও বইটি নিজেকে ধ্রুপদী সিরাত গ্রন্থের বিকল্প বলে দাবি করে নি। বরং এটা সেই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারে ঢোকার একটা সহজ দরজা হতে চেয়েছে। কঠিন পরিভাষাগুলো সহজ ভাষায় লেখার ফলে একজন বড় গবেষক থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া বা একদম নতুন পাঠক—সবাই এটা সমান সহজে বুঝতে পারবেন।
সব মিলিয়ে এক নজরে সীরাত পুরনো ঐতিহ্য আর নতুন উপস্থাপনার একটা সুন্দর মেলবন্ধন। যারা নবীজির জীবনকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে না দেখে একটা পূর্ণাঙ্গ, ধারাবাহিক জীবন হিসেবে মনে গেঁথে নিতে চান, আর যারা রঙিন, গোছানো উপস্থাপনায় পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্য বইটা সত্যিই কাজের।
নবীজীবনী পাঠের পথে হাঁটা শুরু করার একটা সহজ, সুন্দর মানচিত্র এই গ্রন্থ।