প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ইহরাম কেবল বিশেষ পোশাক নয়, এটি একটি সার্বিক অবস্থা। মনে করুন, আপনি মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন; ঠিক যেমন মৃত্যুর পর কিয়ামতের দিন বান্দারা আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন।
আপনি যেন দুই টুকরো সেলাইবিহীন কাপড় পরে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিচ্ছেন।
ইহরামের প্রস্তুতি
অনেকেই মনে করেন, শুধু সাদা দুটি কাপড়ের টুকরোই হলো ইহরাম। আসলে পুরুষদের জন্য এই দুটি কাপড় ইহরামের একটি অংশ মাত্র। এগুলোকে বলে ‘ইজার’ ও ‘রিদা’।
‘ইজার’ হলো লুঙ্গির মতো ব্যবহৃত নিচের অংশ আর ‘রিদা’ হলো শরীরের ওপরের অংশের চাদর। ওমরাহ বা হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার আগেই কিছু কাজ সেরে নিতে হয়:
হাত ও পায়ের নখ কেটে ফেলুন।
অপ্রয়োজনীয় লোম পরিষ্কার করুন এবং গোঁফ ছেঁটে নিন।
ভালোভাবে গোসল বা অজু করে নিন।
শুধু পুরুষেরা দাড়ি, মাথা বা শরীরে আতর মাখতে পারেন (কাপড়ে নয়)।
এরপর সেলাইবিহীন ইজার ও রিদা পরিধান করুন।
নারীদের ইহরাম
নারী ও পুরুষের ইহরামের পোশাকে ভিন্নতা রয়েছে। নারীদের আলাদা করে ইজার বা রিদা পরতে হয় না; তাঁরা যেকোনো মার্জিত পোশাক পরতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কাপড় যেন পাতলা বা আঁটসাঁট না হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের মুখমণ্ডল ঢাকতে নিষেধ করেছেন। পিরিয়ড চলাকালেও নারীরা ইহরাম গ্রহণ করবেন, তবে ওই অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করবেন না।
মিকাত ও নিয়ত
ঢাকা থেকে বিমানে যাওয়ার সময় মিকাত আসার আগেই পাইলট ঘোষণা দিলে অজু করে ওমরাহর নিয়ত করে নিতে হবে। আর যাঁরা মদিনা থেকে মক্কায় যাবেন, তাঁরা ‘জুল হুলায়ফা’ মসজিদে (মিকাত) এসে ইহরাম ও নিয়ত করবেন।
নিয়ত হলো মনের সংকল্প। মুখে এভাবে বলতে পারেন— ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা ওমরাতান’।
যার অর্থ: ‘হে আল্লাহ, ওমরাহর জন্য আপনার দরবারে আমি হাজির।’ বাংলায় বলতে পারেন, ‘হে আল্লাহ, আমি ওমরাহর নিয়ত করলাম, এটি আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করুন।’
নামাজ ও তালবিয়া
নিয়ত করার পর সুযোগ থাকলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিন। বিমানে থাকলে নিজের সিটেই নামাজ আদায় করা যায়। এরপর বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করুন। পুরুষেরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচু স্বরে (যেন নিজে শুনতে পান) তালবিয়া পড়বেন।
তালবিয়া: ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’
অর্থ: আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব শুধু আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৪৯)
ইহরামে যা বর্জনীয়
ইহরাম অবস্থায় কিছু কাজ নিষিদ্ধ। স্বেচ্ছায় এসব কাজ করলে ‘দম’ বা পশু কোরবানি দিয়ে কাফফারা দিতে হয়। নিষিদ্ধ কাজগুলো হলো:
শরীরের কোনো অংশের চুল বা নখ কাটা।
সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করা।
পুরুষদের জন্য সেলাই করা কাপড় বা টুপি পরা।
নারীদের মুখ ঢাকা বা হাতমোজা পরা।
পশু শিকার করা। এমনকি মশা-মাছি মারা বা গাছের পাতা ছেঁড়াও নিষেধ।
ঝগড়া-বিবাদ বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়া।
স্ত্রী সহবাস বা কামভাব উদ্রেককারী কোনো আচরণ করা।
যা করা যাবে
ইহরাম অবস্থায় বেল্ট, হিয়ারিং এইড, ঘড়ি বা চশমা ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজন হলে গন্ধহীন সাবান দিয়ে গোসল করা এবং ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা বা ধোয়া যাবে।