আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের পর মানুষ যখন তাওহিদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য নুহ (আ.)-কে প্রেরণ করেন।
তিনি এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানান। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে অহংকার ও অবাধ্যতায় অটল থাকে। একপর্যায়ে মহাপ্লাবনের মাধ্যমে এই অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করা হয়।
কেন মহাপ্লাবনের শাস্তি আসে
আল্লাহ-তাআলা কখনো কোনো জাতিকে সতর্কবার্তা ছাড়া শাস্তি দেন না। নবী নুহের সম্প্রদায়ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আল্লাহ তাদের কাছে নুহকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি তাদের এ মর্মে দাওয়াত প্রদান করেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৯)
কিন্তু নুহের সম্প্রদায় পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণে লিপ্ত থাকে। তারা ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর নামে কয়েকজন নেককার মানুষের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে তৈরি মূর্তির উপাসনা শুরু করে।
কোরআনে তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে এভাবে, ‘তোমরা কখনো তোমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করো না, বিশেষ করে ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরকে ছেড়ে দিয়ো না।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ২৩)
এগুলো মূলত সৎ ব্যক্তিদের নাম ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পর শয়তান মানুষকে প্রথমে স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে। অতঃপর কয়েক প্রজন্ম অতিক্রম করলে সেগুলোর উপাসনা শুরু হয়। এভাবেই প্রথম শিরকের সূচনা ঘটে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯২০)
গোত্রের নেতারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে থাকে। তারা নবীকে সাধারণ মানুষ বলে অবজ্ঞা এবং তাঁর অনুসারীদের সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির লোক বলে উপহাস করত।
নুহের ধর্ম প্রচার
নুহ (আ.) দীর্ঘ ৯৫০ বছর তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থান করে প্রকাশ্যে, গোপনে, রাতে ও দিনে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেন। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ১৪)
তিনি মানুষকে আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি তোমরা তওবা করো, তাহলে আল্লাহ আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং বাগান ও নদী দান করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
কিন্তু গোত্রের নেতারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে থাকে। তারা নবীকে সাধারণ মানুষ বলে অবজ্ঞা এবং তাঁর অনুসারীদের সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির লোক বলে উপহাস করত। তারা বলত, সে তো আমাদেরই মতো একজন মানুষ। (সুরা হুদ, আয়াত: ২৭)
নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
শুধু অবিশ্বাসই নয়, নুহের সম্প্রদায় তাঁর দাওয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য সক্রিয় ষড়যন্ত্রও করেছিল। একপর্যায়ে নুহ (আ.) আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ২২)
মানুষ যখন সত্যকে বারবার প্রত্যাখ্যান করে, উপদেশকে উপহাসে পরিণত করে এবং অন্যদেরও সত্য গ্রহণে বাধা দেয়, তখন আল্লাহর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
বহু শতাব্দী ধরে সুযোগ দেওয়ার পরও যখন অধিকাংশ মানুষ মূর্তিপূজা থেকে ফিরে এলো না, তখন নুহ (আ.) আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, ‘হে আমার রব, পৃথিবীর বুকে কাফিরদের একজনকেও বাসিন্দা হিসেবে অবশিষ্ট রেখো না।’ সুরা নুহ, আয়াত: ২৬)
নৌকা নির্মাণের নির্দেশ
যখন আল্লাহ ঘোষণা করলেন, অবিশ্বাসী জাতির ওপর শাস্তি অবধারিত, তখন একই সঙ্গে তিনি তাঁর প্রিয় বান্দা নুহকে এবং তাঁর অনুসারীদের নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাও করে দিলেন। আল্লাহ ওহির মাধ্যমে নির্দেশ দিলেন, ‘আমার তত্ত্বাবধানে এবং আমার ওহি অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করো।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৩৭)
এ নির্দেশের মধ্যে একটি গভীর ইমানি শিক্ষা নিহিত রয়েছে। আল্লাহ চাইলে কোনো নৌকা ছাড়াই নুহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করতে পারতেন।
কিন্তু তিনি তাদের দিয়ে নৌকা নির্মাণ করালেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ উপায়-উপকরণ পরিত্যাগ করা নয়, বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
তৎকালীন সমাজে বিশাল নৌকা নির্মাণ ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা। বিশেষ করে এমন স্থানে, যেখানে নদী বা সমুদ্রের উপস্থিতি ছিল না।
তখনকার বাস্তবতা
তৎকালীন সমাজে বিশাল নৌকা নির্মাণ ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা। বিশেষ করে এমন স্থানে, যেখানে নদী বা সমুদ্রের উপস্থিতি ছিল না।
ফলে নুহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে নৌকা নির্মাণ শুরু করলেন, তখন তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতে লাগল। কোরআনে এসেছে, ‘যখনই তাঁর সম্প্রদায়ের নেতারা তাঁর পাশ দিয়ে যেত, তারা তাঁকে বিদ্রুপ করত।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৩৮)
নবীও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের জবাব দেন, ‘আজ যদি তোমরা আমাদের নিয়ে উপহাস করো, তবে একদিন আমরাও তোমাদের নিয়ে উপহাস করব, যেমন তোমরা এখন উপহাস করছ। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার ওপর এমন শাস্তি আসে, যা তাকে লাঞ্ছিত করবে এবং কার ওপর স্থায়ী শাস্তি নেমে আসে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৩৮-৩৯)
মহাপ্লাবন কীভাবে শুরু হয়েছিল
নৌকা নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর আল্লাহর নির্ধারিত মুহূর্ত উপস্থিত হলো। একটি বিশেষ নিদর্শন তথা তান্নুর (চুলা) থেকে পানি উথলে ওঠা প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নুহ (আ.) বুঝতে পারলেন, শাস্তির সময় এসে গেছে।
এরপর আকাশ ও পৃথিবী উভয় দিক থেকেই পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রবল বর্ষণকারী বৃষ্টি দিয়ে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দিয়েছিলাম এবং পৃথিবীকে উৎসধারায় পরিণত করেছিলাম। অতঃপর উভয় দিকের পানি এক নির্ধারিত কাজে মিলিত হলো।’ (সুরা কামার, আয়াত: ১১-১২)
এ দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। সাধারণ বন্যায় কেবল বৃষ্টি হয় বা নদী উপচে পড়ে, কিন্তু নুহের সময় আকাশ থেকে অবিরাম বর্ষণ এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকেও পানির উৎস ফেটে বের হয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সমগ্র অঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়।
নুহ (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নৌকায় আরোহণ করলেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনরাও আশ্রয় নিলেন। নৌকা চলতে শুরু করল উত্তাল ঢেউয়ের ওপর। কোরআন সেই দৃশ্যকে অত্যন্ত জীবন্ত ভাষায় বর্ণনা করেছে, ‘আর নৌকাটি তাদের নিয়ে পর্বতসম ঢেউয়ের মধ্যে চলতে লাগল।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪২)
একটি হৃদয়বিদারক চিত্র
এ সময় ঘটে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। নবীর এক ছেলে ইমান গ্রহণ করেনি। পিতার আহ্বান সত্ত্বেও সে পাহাড়ে আশ্রয় নিলে রক্ষা পাবে, এমন ধারণা পোষণ করেছিল। নুহ (আ.) তাকে ডাকলেন, ‘হে আমার সন্তান, আমাদের সঙ্গে নৌকায় উঠে পড়ো, কাফিরদের সঙ্গে থেকো না।’
কিন্তু ছেলে বলল, ‘আমি এমন একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে।’ তখন নুহ (আ.) বললেন, ‘আজ আল্লাহর আদেশ থেকে রক্ষা করার মতো কেউ নেই, তিনি যাকে দয়া করবেন সে ছাড়া।’ এরপর একটি ঢেউ তাদের দুজনের মাঝখানে এসে পড়ে এবং সে ডুবে যায়।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪২-৪৩)
প্রকৃতপক্ষে ইমান ছাড়া বংশ কিংবা পারিবারিক পরিচয় কাউকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে না।
এ সময় ঘটে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। নবীর এক ছেলে ইমান গ্রহণ করেনি। পিতার আহ্বান সত্ত্বেও সে পাহাড়ে আশ্রয় নিলে রক্ষা পাবে, এমন ধারণা পোষণ করেছিল।
কারা নৌকায় উঠেছিলেন
আল্লাহর নির্দেশে নবী নৌকায় ইমানদারদের, তাঁর মুমিন পরিবার-পরিজনকে এবং বিভিন্ন প্রাণীর এক জোড়া করে আশ্রয় দেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। তাদের সংখ্যা সম্পর্কে ১০, ৭২ বা ৮০ জনের ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।
এ ছাড়া বাকি সবাই আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি তাঁর স্ত্রীও ইমান গ্রহণ না করায় রক্ষা পায়নি। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৪৮১, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)
প্লাবনের সমাপ্তি ও নৌকার অবতরণ
আল্লাহর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্লাবন অব্যাহত থাকার পর শাস্তির পর্ব শেষ হলো। তখন আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশকে নির্দেশ দিলেন, ‘হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি শুষে নাও এবং হে আকাশ! তুমি থেমে যাও। অতঃপর পানি হ্রাস পেল, ফয়সালা সম্পন্ন হলো এবং নৌকাটি জুদি পর্বতের ওপর স্থির হলো।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪৪)
প্লাবন শেষ হওয়ার পর নুহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। এ কারণেই অনেক আলেম নবী নুহকে ‘মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, মহাপ্লাবনের পর তাঁর বংশধরদের মাধ্যমেই পৃথিবীতে আবার মানুষের বিস্তার ঘটে। এ বিষয়ের প্রতি কোরআনেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। (সুরা সাফফাত, আয়াত: ৭৭)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা