মানুষকে দেওয়া আল্লাহর অমূল্য আমানত
নিজেকে কে না ভালোবাসে! মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজেকে অনেক বেশি ভালোবাসে। আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমাদের কতই না প্রিয়! কোনো অঙ্গে সামান্য একটু আঘাত পেলেই আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি।
দেহের প্রতিটি অঙ্গই আমাদের জন্য দয়াময় আল্লাহর মহামূল্য নেয়ামত ও অমূল্য সম্পদ। যার কোনো একটি অঙ্গ নেই, সে–ই কেবল বোঝে তার অভাব ও যন্ত্রণা। আল্লাহ-তাআলা দয়া করে আমাদের এই অঙ্গগুলো দিয়েছেন সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে।
এগুলো পেতে আমাদের কোনো মূল্য দিতে হয়নি, করতে হয়নি কোনো কষ্ট। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিয়ে কিয়ামতের দিনে আমাদের কঠোর হিসাব দিতে হবে—এ সত্য আমরা অনেকেই হয়তো জানি না বা ভুলে যাই।
যে ব্যাপারে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রতিটিই জিজ্ঞাসিত হবে।কোরআন, সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬
নেয়ামতের চরম অকৃতজ্ঞতা
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে মানুষ বিনা মূল্যে পাওয়া এই নেয়ামতগুলোকে অনেক সময় গুরুত্বহীন মনে করে এবং সেগুলোর যথেচ্ছ অপব্যবহার করে।
অনেকে চোখ দিয়ে নিষিদ্ধ বস্তু দেখে, হাত দিয়ে অন্যায় করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য লেখে এবং মুখ দিয়ে মিথ্যা ও পরনিন্দায় লিপ্ত হয়। আল্লাহর দেওয়া অমূল্য আমানতকে তাঁরই নিষিদ্ধ কাজে ব্যবহার করা চরম অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কোরআনের সতর্কবাণী
কেয়ামতের কঠিন দিনে আমাদের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর কাছে কথা বলবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ আগেই আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘যে ব্যাপারে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রতিটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ কেয়ামতের সেই ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৬৫)
শুধু অঙ্গগুলোই নয়, এমনকি আমাদের শরীরের চামড়া বা ত্বকও সেদিন আমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা তাদের চামড়াকে বলবে, “তোমরা আমাদের বিপক্ষে কেন সাক্ষ্য দিলে?” চামড়া বলবে, “যে আল্লাহ সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি আমাদেরও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।”’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২১)
আল্লাহ-তাআলা আরও বলেছেন, ‘তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে তোমাদের কান, চোখ ও চামড়া তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। বরং তোমরা মনে করেছিলে, তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২২)
অনেকে চোখ দিয়ে নিষিদ্ধ বস্তু দেখে, হাত দিয়ে অন্যায় করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য লেখে এবং মুখ দিয়ে মিথ্যা ও পরনিন্দায় লিপ্ত হয়।
ইবনুল জাওজির হৃদয়স্পর্শী মোনাজাত
বিখ্যাত আলেম ইবনুল জাওজি (রহ.) তাঁর এক মোনাজাতে অঙ্গগুলোর পবিত্রতা রক্ষার গুরুত্ব এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, যে জিহ্বা মানুষকে আপনার কথা জানায়, আপনি তাকে শাস্তি দেবেন না। যে চোখ আপনার পথের ইলমের দিকে তাকায়, আপনি তাকে শাস্তি দেবেন না। যে হাত আপনার রাসুলের হাদিস লিপিবদ্ধ করে, আপনি তাকে শাস্তি দেবেন না। আপনার ইজ্জতের কসম! আমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না।’ (আদাবুল মাওআজাহ, পৃষ্ঠা ৯৯, শামেলা সংস্করণ)
শেষ কথা
ইবনুল জাওজি (রহ.) নিজের জন্য যে প্রার্থনাগুলো করেছেন, আসুন আমরাও রবের কাছে সেই একই আকুতি জানাই। এই দোয়াগুলো যেন শুধু মুখে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আমাদের বাস্তব জীবনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহারে ফুটে ওঠে। প্রতিটি অঙ্গ যেহেতু আল্লাহর আমানত, তাই এই আমানতের হেফাজত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব
আল্লাহ-তাআলা যেন আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যে দৃঢ় রাখেন এবং আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের পথে ব্যবহার করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক