মুসলিম বিশ্বে যেভাবে সাহিত্যিকদের বরণ করা হতো

ছবি: পেক্সেলস

‘ম্যান বুকার পুরস্কার’ বা ‘নোবেল সাহিত্য পুরস্কার’ এখন বিশ্বসাহিত্যের সেরা সম্মাননা বলে গণ্য করা হয়। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা যায়, আরব-মুসলিম ঐতিহ্যে সাহিত্যিক ও কবিদের সম্মাননা জানানোর প্রথাটি ছিল এর চেয়ে কম জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না।

বিংশ শতাব্দীতে ‘নোবেল’ বা ‘ম্যান বুকার’-এর মতো পুরস্কারগুলো আসার বহু শতাব্দী আগেই মুসলিম সভ্যতায় সাহিত্য প্রতিযোগিতা এবং রাজকীয় সম্মাননার এক স্বর্ণযুগ অতিবাহিত হয়েছে।

সে যুগে কেবল কবিরাই নন, বরং বড় বড় ফকিহ ও বিচারকরা নিয়োগ পেতেন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নির্বাচনের বিচারক হিসেবে। আজ আমরা মদিনার মরুপ্রান্তর থেকে বাগদাদ ও কর্ডোভার রাজপ্রাসাদে কবিদের সেই রাজকীয় সম্মানের গল্প শুনব।

সাহিত্যের বাজার থেকে রাজদরবার

ইসলাম-পূর্ব আরবে কোনো গোত্রে একজন সুবক্তা বা কবির জন্ম হওয়া ছিল এক বিশাল জাতীয় উৎসবের মতো। ইতিহাসবিদ ইবনে রশিক আল-কাইরাওয়ানি তাঁর আল-উমদাহ গ্রন্থে লিখেছেন, “আরবদের কোনো গোত্রে যখন কোনো কবির আবির্ভাব ঘটত, তখন অন্য গোত্রগুলো এসে অভিনন্দন জানাত। ভোজের আয়োজন করা হতো, নারীরা বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন; ঠিক যেমনটি বিয়ের উৎসবে করা হয়।” (ইবনে রশিক, আল-উমদাহ, ১/৬৫, কায়রো)

ইসলামের আগমনের পর এই ধারা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। নবীজি (সা.)–এর যুগে কবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন ইসলামের অন্যতম কণ্ঠস্বর। খলিফা ওমরের শাসনামলে সরকারিভাবে কবিদের থেকে কবিতা আহ্বান করার নজির পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক ইবনে হাজার আসকালানি বর্ণনা করেছেন, ওমর (রা.) কুফার গভর্নরকে লিখেছিলেন—সেখানকার কবিরা ইসলাম সম্পর্কে কী লিখেছেন, তা যেন পেশ করা হয়।

সেই ‘অফিসিয়াল’ সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন সাহাবি কবি লাবিদ ইবনে রাবিআ এবং পুরস্কার হিসেবে তাঁর সরকারি ভাতা ৫০০ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। (ইবনে হাজার, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ, ৫/৫০৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত)

আরও পড়ুন

সাহিত্যই যখন প্রধান বিনোদন

আব্বাসীয় ও সেলজুক আমলে সাহিত্যিকদের কদর পৌঁছেছিল অনন্য উচ্চতায়। তৎকালীন বিখ্যাত উজির ‘সাহেব ইবনে আব্বাদ’ সগর্বে বলতেন, তাঁর গুণগানে কবিরা ১ লক্ষ কবিতা রচনা করেছেন।

আরও বিস্ময়কর তথ্য দেন ইতিহাসবিদ ইবনে আইবেক আস-সাফাদি। তিনি জানান, সেলজুক উজির নিজামুল মুলকের প্রশংসা করে কবিতা পড়তেন ৫ হাজারের বেশি কবি! কেবল তাঁর প্রশংসাতেই রচিত হয়েছিল ৩ লক্ষেরও বেশি কসিদা বা দীর্ঘ কবিতা। (আস-সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফিয়াত, ৩/২০৩)

আজকের যুগে নোবেলজয়ীর ছবি দেওয়ালে টাঙানো হয়, কিন্তু সে যুগে কবিদের নামে আলাদা ‘দেওয়ান’ বা দপ্তর থাকত। কবি আল-বুহতারি বা আবু তামামরা ছিলেন সে সময়ের মহাতারকা। তাঁদের একেকটি কবিতার পুরস্কারের মূল্যমান আজকের হিসাবে কয়েক লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে যেত।

বিচারকদের রায় এবং নিখুঁত মানদণ্ড

সেকালে পুরস্কার কেবল তোষামোদের জন্য দেওয়া হতো না, বরং এর পেছনে ছিল কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া।

খলিফা আবু জাফর মনসুরের দরবারে একবার এক কাব্য প্রতিযোগিতা হয়। কবি ইবনে হিরমাহ যখন তাঁর বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিগুলো শোনালেন, তখন খলিফা পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে ১০ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) পুরস্কার দেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! (আবু আলি আল-কালি, আল-আমালি, ১/২০)

সাহিত্য বিচারে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরবের পণ্ডিতরা ছিলেন আপসহীন। বিখ্যাত ভাষাবিদ ইবনে জিন্নি বলতেন, “ধর্মীয় বিশ্বাস বা মতাদর্শ কবির কবিতার মান নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না।” (আস-সুয়ুতি, আল-মুযহির ফি উলুমিল লুগাহ, ২/৩৯৮, বৈরুত)

এমনকি কবিদের যোগ্যতা পরীক্ষার জন্য ‘লাইভ টেস্ট’ বা তাৎক্ষণিক কবিতা রচনার পরীক্ষা নেওয়া হতো। যদি কারও কবিতা নিয়ে সন্দেহ হতো, তবে উজির বা সুলতানরা তাকে তৎক্ষণাৎ নতুন কোনো বিষয়ে কবিতা লিখতে বলতেন। উত্তীর্ণ হলেই মিলত ‘রাজকীয় সম্মাননা’।

আরও পড়ুন

নারী সাহিত্যিকদের বীরত্বগাথা

মধ্যযুগের এই সাহিত্য আসরগুলো কেবল পুরুষদের একচেটিয়া ছিল না। সাকিনা বিনতে হোসাইন বা উমাইয়া রাজকন্যা ওয়াল্লাদা বিনতে আল-মুসতাকফির মতো বিদুষী নারীরা কবিদের আসর পরিচালনা করতেন।

বড় বড় পুরুষ কবিরা তাঁদের সামনে কবিতা পড়ে বিচার প্রার্থনা করতেন। সাকিনা বিনতে হোসাইনের বাড়িতে যখন কবি জারির বা ফারাজদাক আসতেন, তিনি তাঁদের কবিতার ভুল ধরিয়ে দিতেন এবং শ্রেষ্ঠজনকে ১ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত পুরস্কার দিতেন। (সিবত ইবনুল জাওজি, মিরআতুজ জামান, ৭/০০)

যখন পুরস্কার ছিল রাষ্ট্রের নীতি

আন্দালুস বা স্পেনের মুসলিম শাসনামলে সাহিত্যিকদের জন্য ছিল ‘দেওয়ানে শুয়ারা’ বা কবিদের জন্য আলাদা প্রশাসনিক বিভাগ। সেখানে কবিদের মেধা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত করা হতো এবং তাঁদের জন্য নিয়মিত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা ছিল।

এটি ছিল আজকের যুগের ‘একাডেমি অব লেটারস’-এর এক উন্নত সংস্করণ।

ইউরোপীয় রেনেসাঁ বা আধুনিক সাহিত্যের যে জৌলুস আমরা দেখি, তার বহু আগে মুসলিম উম্মাহ সাহিত্যের মাধ্যমে জ্ঞান ও সৃজনশীলতাকে সম্মান জানাতে শিখেছিল।

৫ হাজার কবির সেই মিছিল কিংবা দুনিয়া কাঁপানো পঙ্‌ক্তিগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কলমের শক্তিই চিরকাল সভ্যতাকে পথ দেখিয়েছে। মধ্যযুগের সেই ‘নোবেল পুরস্কারগুলো’ কেবল অর্থ দেয়নি, বরং মানবতাকে দিয়েছিল অমর সব সাহিত্যকর্ম।

সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট

আরও পড়ুন