পরকালে শয়তান যেভাবে তার প্রতারণার কথা স্বীকার করবে

ছবি: ফ্রিপিক

মানুষের চিরশত্রু ইবলিশ শয়তান। মিথ্যা আশার জালে বন্দি করে সে মানুষকে এমন এক অতল গহ্বরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ থাকে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা কেয়ামতের দিবসে পথভ্রষ্ট অনুসারী এবং শয়তানের মধ্যকার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন।

ঘৃণার সেই মুহূর্ত

পরকালের কঠিন মুহূর্তে অবিশ্বাসীরা যখন দেখবে যে তাদের সব সম্বল ধুলোয় মিশে গেছে এবং তারা দোজখের দ্বারপ্রান্তে, তখন তাদের অন্তরে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। তারা সেই সব মানুষ ও শয়তানকে খুঁজবে যারা তাদের বিভ্রান্ত করেছিল।

অথচ দুনিয়াতে তাদের পরম বন্ধু বা আদর্শ মেনেছে তারা। বন্ধুত্ব সেদিন চরমতম শত্রুতায় রূপ নেবে।

কোরআনের ভাষায়, “কাফেররা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদের আমাদের দেখিয়ে দিন; আমরা তাদের আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টতরদের (আসফালিন) অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২৯)

এই আয়াতে পায়ের নিচে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাদের হৃদয়ে ফুটতে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অথচ দুনিয়াতে তাদের পরম বন্ধু বা আদর্শ মেনেছে তারা। বন্ধুত্ব সেদিন চরমতম শত্রুতায় রূপ নেবে।

আরও পড়ুন

আল্লামা তানতাভি লিখেছেন, তারা তাদের প্ররোচনাকারীদের পায়ের নিচে দলিত করে অপমানিত করতে চাইবে এবং চাইবে তারা যেন নরকের সবচেয়ে গভীর ও নিকৃষ্ট স্তরে নিক্ষিপ্ত হয়। (মুহাম্মদ সাইয়িদ তানতাভি, আত-তাফসিরুল ওয়াসিত, ১৩/৯৪, দারু নাহদাতিল মিসর, কায়রো, ১৯৯৮)

ইবলিশের ঐতিহাসিক ভাষণ

শয়তানের অনুসারীরা যখন দেখবে যে তারা চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তখন তারা শয়তানকে দোষারোপ করতে শুরু করবে। ঠিক সেই মুহূর্তে ইবলিশ একটি ভাষণ দেবে, যা কোরআনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে।

শয়তান বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা ছিল সত্য ওয়াদা, আর আমি তোমাদের যে ওয়াদা দিয়েছিলাম তা এখন আমি ভঙ্গ করলাম।
কোরআন, সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২২

“যখন সব বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা ছিল সত্য ওয়াদা, আর আমি তোমাদের যে ওয়াদা দিয়েছিলাম তা এখন আমি ভঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার কোনো আধিপত্য ছিল না, আমি তো শুধু তোমাদের ডেকেছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে।” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২২)

ইবলিশ সেদিন সত্যকে স্বীকার করে নেবে। সে বুঝিয়ে দেবে, প্রকৃত কল্যাণ ছিল নবী-রাসুলদের পথে। সে স্রেফ মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে মন্দকে সুন্দর করে সাজিয়েছিল।

আরও পড়ুন

নিজেদের দোষারোপ করার আহ্বান

পরকালে শয়তানের বক্তব্যে কোনো সান্ত্বনা থাকবে না, থাকবে শুধু নির্দয় বিদ্রূপ। সে তার অনুসারীদের মনে করিয়ে দেবে যে স্রষ্টার পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা আসা সত্ত্বেও তারা জেনে-বুঝে ভুল পথ বেছে নিয়েছিল। 

শয়তান বলবে, “অতএব, আজ তোমরা আমাকে দোষারোপ করো না, বরং নিজেদেরই দোষারোপ করো। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে পারব না এবং তোমরাও আমাকে সাহায্য করতে পারবে না।” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২২)

শয়তান জানে যে সে নিজেও আজ আল্লাহর আজাব থেকে রেহাই পাবে না, তাই সে তার অনুসারীদের দায়ভার নিতে অস্বীকার করবে।

পরকালে তাদের চরম লাঞ্ছনা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হবে। তারা সেদিন চাইবে অন্যদের নিচু করতে, কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেরাই নিজেদের কৃতকর্মের জন্য নিকৃষ্টতম স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে।

শয়তানের প্রতারণার কৌশল

শয়তান মানুষকে একবারে বড় পাপে লিপ্ত করে না, বরং সে ‘খুতুওয়াতুশ শয়তান’ (পদাঙ্ক অনুসরণ) নীতি অবলম্বন করে। ছোট ছোট পদক্ষেপে সে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

প্রথমে সে পাপকে সুন্দর দেখায়, তারপর সেই পাপে অভ্যস্ত করে তোলে এবং সবশেষে মানুষের অন্তরকে এমনভাবে মোহগ্রস্ত করে যে সে আর সত্য দেখতে পায় না। কোরআনে বারবার সাবধান করা হয়েছে: “হে ইমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” (সুরা নূর, আয়াত: ২১)

দুনিয়াতে যারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে অহংকার ও বিদ্রোহ করেছিল, পরকালে তাদের চরম লাঞ্ছনা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হবে। তারা সেদিন চাইবে অন্যদের নিচু করতে, কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেরাই নিজেদের কৃতকর্মের জন্য নিকৃষ্টতম স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে।

আরও পড়ুন