মিলিয়ন হাফেজ আর আন্দালুসিয় আভিজাত্যের দেশ

রমজানের খেজুরের বাজার, লিবিয়াছবি: এএফপি

লিবিয়ার রমজান মানেই হলো আধ্যাত্মিকতা, বীরত্বগাথা আর অতুলনীয় আতিথেয়তার এক অনন্য মিশেল। ত্রিপোলির প্রাচীন অলিগলি থেকে শুরু করে বেনগাজির সমুদ্রতীর পর্যন্ত—পুরো দেশটিতে রমজান আসে এক ঐশ্বরিক প্রশান্তি নিয়ে।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আর দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও, লিবীয়দের হৃদয়ে রমজানের উষ্ণতা একটুও কমেনি।

ত্রিপোলির আন্দালুসিয় আভিজাত্য

রাজধানী ত্রিপোলিতে রমজান আসে আভিজাত্য নিয়ে। এখানকার সংস্কৃতিতে প্রাচীন আন্দালুসিয় এবং সুফি প্রভাব স্পষ্ট।

  • রোজাত্তা: ত্রিপোলির ইফতারের এক বিশেষ পানীয় হলো রোজাত্তা। এটি কাঠবাদাম বা বার্লির নির্যাস থেকে তৈরি করা হয় এবং সুগন্ধি ‘জল-ফুল’ (Orange Blossom Water) দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

  • শাই বিল শাকশুকা: রাতের আড্ডায় লিবিয়ানদের প্রধান সঙ্গী হলো বিশেষ রগযুক্ত সবুজ চা, যার ওপরে থাকে ঘন ফেনা। এর সাথে থাকে রোস্টেড কাঠবাদাম বা চীনাবাদাম।

বেনগাজির ‘সুক আল-হুত’

বেনগাজির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘সুক আল-হুত’ বা মাছের বাজারটি যুদ্ধের ক্ষত ছাপিয়ে রমজানে হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এখানে ছোট ছোট দোকানগুলোতে বাড়ির তৈরি খাবার বিক্রি হয়।

পুরো পরিবার মিলে কেউ খাবার রান্না করে, কেউ প্যাকেট করে আর ছোটরা বিক্রি করে—এটি লিবিয়ান পরিবারের একতার এক অনন্য উদাহরণ।

ফ্রি ইফতারের আয়োজন
ছবি: আনাদোলু
আরও পড়ুন

দেরনার ‘নাউরা’

দেরনা শহরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এক বিশাল সাইরেন বা ‘নাউরা’ আজও বিদ্যমান। একসময় এটি বিমান হামলার সতর্ক সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন তা ব্যবহৃত হয় রমজানের চাঁদ দেখা এবং ইফতারের সময় জানানোর জন্য

যদিও এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু এই সাইরেনটি আজও দেরনাবাসীর কাছে নস্টালজিক।

লিবিয়ান ইফতারির প্রধান আকর্ষণ

লিবিয়ার ইফতার টেবিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ দস্তরখান।

  • লিবিয়ান শোরবা : এটি লিবিয়ার ইফতারের প্রাণ। ছোট দানার পাস্তা, মাংস এবং পুদিনা পাতার সুগন্ধে তৈরি এই লাল রঙের স্যুপটি ছাড়া লিবিয়ানদের ইফতার অসম্পূর্ণ।

  • এমবাতান: দুই টুকরো আলুর মাঝখানে কিমা ও মসলার পুর দিয়ে ডুবো তেলে ভাজা এক বিশেষ খাবার।

  • বাজিন: যবের আটা দিয়ে তৈরি এই খাবারটি লিবিয়ার জাতীয় খাবার হিসেবে পরিচিত। এটি সাধারণত মাংসের ঝোল ও ডিম দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

বার্লি, প্রোটিন এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ উপাদানে তৈরি ‘বাজিন’
ছবি: আল–জাজিরা
আরও পড়ুন

মিলিয়ন হাফেজের দেশ

লিবিয়াকে বলা হয় ‘এক মিলিয়ন হাফেজের দেশ'। হাফেজ বলা হয় যাদের পবিত্র কোরআন মুখস্থ। কোরআন রমজানে এখানকার প্রতিটি মসজিদ মুখরিত থাকে কোরআন তিলাওয়াতে। বিশেষ করে শিশুদের উৎসাহিত করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় হাফেজদের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

তারাবির নামাজের পর প্রাচীন শহরতলিগুলোতে ‘মালুফ’ (এক প্রকার ঐতিহ্যবাহী সুফি গান) এর আসর বসে।

‘জৌকা’ ও লিবীয় আতিথেয়তা

লিবীয়দের এক অনন্য প্রথা হলো ‘জৌকা’ (The Tasting)। ইফতারের ঠিক আগে প্রতিবেশী ও বন্ধুদের মাঝে খাবারের থালা বিনিময় করাকে জৌকা বলা হয়। ত্রিপোলির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য হলো, একসময় যখন কাজের সন্ধানে আসা অবিবাহিত তরুণরা হোটেলে থাকতেন, তখন স্থানীয় পরিবারগুলো পালা করে তাদের জন্য ইফতার পাঠিয়ে দিত।

আজও লিবীয়রা গর্ব করে বলে—“এই দেশে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ একা ইফতার করে না।”

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক রাত

তারাবির নামাজের পর লিবিয়ার রাস্তাগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বেনগাজির সৈকতে শুরু হয় বালুর ওপর গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা (Drifting) এবং বিচ ফুটবল।

আর বড়রা কফিশপে বসে ‘শাই বিল-শাকশুকা’ (ফেনা তোলা চা) পান করতে করতে আরব্য রজনীর মতো ‘কারাগুজ’ বা ছায়া নাটক দেখে ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন করেন।

আরও পড়ুন