ইফতার যেখানে শিশুদের উৎসব আর বড়দের ‘মজলিস’

রমজানে বাহরাইনের রাজপথের সাজছবি: সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া

বাহরাইনের রমজান হলো আভিজাত্য আর লৌকিকতার এক অপূর্ব মিশ্রণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইন তার দীর্ঘদিনের ‘মজলিস’ সংস্কৃতির জন্য অনন্য।

এখানে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং এটি সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে ঝালিয়ে নেওয়ার এক মহোৎসব।

‘মজলিস’: বড়দের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা

বাহরাইনের রমজানের প্রাণ হলো এর ‘মজলিস’। প্রায় প্রতিটি বড় পরিবার বা গোত্র তাদের ঘরের দরজা ইফতারের পর উন্মুক্ত করে দেয়।

মানামা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১০০-র বেশি কোরআনি মজলিস রয়েছে। এখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই গোল হয়ে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন।

তবে তেলাওয়াত শেষ হতেই এই মজলিসগুলো পরিণত হয় রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজচিন্তার উন্মুক্ত ফোরামে। এমনকি অমুসলিম কূটনীতিকরাও এই মজলিসে এসে বাহরাইনি আতিথেয়তার স্বাদ নেন।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, অনেক মজলিস এখন ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বড় স্ক্রিনে সামাজিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা বা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও রাখছে।

বাহরাইনিদের অত্যন্ত প্রিয় ‘নাখি’ এটি আসলে মশলাদার ছোলা সেদ্ধ। পেঁয়াজ, লঙ্কা আর টমেটো দিয়ে তৈরি এই পদটি
ছবি: আল–জাজিরা ডটনেট
আরও পড়ুন

ইফতারের পর ‘নাকসা’ ও ‘গাবকা’

ইফতারের পর বাহরাইনিদের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠান হলো ‘গাবকা’ (Ghabga)। এটি মূলত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের একটি নৈশভোজ, যা তারাবির পর মধ্যরাত পর্যন্ত চলে।

এখানকার একটি চমৎকার প্রথার নাম ‘নাকসা’। ইফতারের ঠিক আগে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাটি ভর্তি খাবার নিয়ে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যায়। এই আদান-প্রদানকে বলা হয় ‘নাকসা’, যা প্রতিবেশীদের মধ্যে ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করে।

গাবকার টেবিলে থাকে রাজকীয় ‘হারিস’ (গম ও মাংসের মণ্ড), ‘থারিদ’ (ঝোল ভেজানো রুটি) এবং মিষ্টি হিসেবে ‘লুকাইমাত’।

ঐতিহ্যবাহী ইফতার

বাহরাইনি ইফতারের টেবিলে বিশেষ কিছু পদ না থাকলে যেন চলেই না:

  • নাখি: এটি আসলে মশলাদার ছোলা সেদ্ধ। পেঁয়াজ, লঙ্কা আর টমেটো দিয়ে তৈরি এই পদটি বাহরাইনিদের অত্যন্ত প্রিয়।

  • বালালিদ: এটি মিষ্টি ও ঝালের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এলাচ ও জাফরান দেওয়া মিষ্টি সেমাইয়ের ওপর ডিম ভাজা দিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়।

  • খুবজ ও মাহিয়াওয়া: ছোট মাছের সস বা ‘মাহইয়াওয়া’ মাখানো তন্দুরি রুটি বাহরাইনি ইফতারের এক বিশেষ সিগনেচার।

আরও পড়ুন
শিশুদের ‘কুরকাউন’ উৎসব
ছবি: সংগৃহীত

‘কুরকাউন’: শিশুদের উৎসব

রমজানের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে (১৪ বা ১৫ রমজান) বাহরাইন মেতে ওঠে কুরকাউন (Gergaoon) উৎসবে। শিশুরা ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং লোকসংগীত গায়।

বড়রা তাদের ঝুড়িতে বাদাম, চকোলেট আর উপহার ভরে দেন। এটি অনেকটা পশ্চিমা ‘হ্যালোইন’-এর মতো হলেও এর আবেদন সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও ঐতিহ্যগত।

ডিজিটাল যুগে ‘গাবকা’র পরিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০২৪-২০২৬) গাবকা কেবল পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকগুলো এখন তাদের কর্মীদের জন্য ‘কর্পোরেট গাবকা’র আয়োজন করছে।

এতে যেমন কাজের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে, তেমনি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিও বজায় থাকছে।

আরও পড়ুন