কোরআনে সমালোচনার পরও মহানবী (সা.) কেন কবিদের মর্যাদা দিয়েছেন

ছবি: পেক্সেলস

প্রাক্‌-ইসলামি যুগে আরবে কবিদের অভাবনীয় প্রতাপ ছিল। তাঁদের একটি কবিতায় কোনো গোত্রের সম্মান যেমন শীর্ষে পৌঁছে যেত, তেমনি একটি ব্যঙ্গ কবিতায় কারও জীবন হয়ে উঠত দুর্বিষহ।

এই কবিদের বড় একটি অংশ মিথ্যাচার, অশ্লীলতা ও অহংকারের চর্চা করতেন। পবিত্র কোরআনে তাদের সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ‘আর কবিদের অনুসরণ করে শুধু বিভ্রান্তরা।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ২২৪)

অথচ আমরা দেখতে পাই, হাসসান ইবনে সাবিতের মতো কবিদের রাসুল (সা.) মসজিদে নববিতে মিম্বর বানিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁদের কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

কোরআনের সমালোচনার প্রেক্ষাপট

কোরআনে কবিদের যে সমালোচনা করা হয়েছে, তা ঢালাওভাবে সব কবির জন্য নয়। জাহিলি যুগের যেসব কবি মূর্তিপূজার গুণগান গাইতেন, ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন এবং মানুষের চরিত্রে নৈতিক অবক্ষয় ডেকে আনতেন, মূলত কোরআনে তাঁদের ‘বিভ্রান্ত’ বলা হয়েছে।

তৎকালীন আরবের বস্তুবাদী কবিরা ছিলেন লাগামহীন; তারা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের তোয়াক্কা না করে শুধু অর্থ ও গোত্রীয় অহংকারের লোভে যার-তার পক্ষে বা বিপক্ষে কবিতা রচনা করতেন; কোরআন মূলত শিল্পের নামে এই অনৈতিকতা ও মিথ্যাচারের সমালোচনা করেছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/১৮৮, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

রাসুল (সা.) কবি হাসসানকে বলতেন, ‘তুমি তাদের (কাফিরদের) কবিতার মাধ্যমে জবাব দাও, জিবরাইল তোমার সঙ্গে আছেন।’ তিনি তাঁর জন্য মসজিদে নববিতে একটি বিশেষ মিম্বর স্থাপন করেছিলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন।
আরও পড়ুন

সত্যনিষ্ঠ কবিরা নয়

মজার ব্যাপার হলো, কোরআন যেখানে কবিদের বিভ্রান্ত বলেছে, ঠিক তার কয়েক আয়াত পরই মুমিন ও সৎকর্মশীল কবিদের এই সমালোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘তবে তারা ছাড়া, যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করেছে এবং অত্যাচারিত হওয়ার পর (কবিতার মাধ্যমে) প্রতিশোধ নিয়েছে।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ২২৭)

অর্থাৎ, যে কবিতা মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ইসলাম তাকে শুধু বৈধই করেনি, বরং উৎসাহিত করেছে।

ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, শিল্পের মাধ্যম হিসেবে কবিতা বা সাহিত্য কখনোই নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি যখন মজলুমের অধিকার আদায় এবং সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। (আল-কুরতুবি, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১৩/১৪৭, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)

নবীজির দরবারে কবিদের মর্যাদা

মক্কার কাফিররা যখন রাসুল (সা.) ও ইসলামের বিরুদ্ধে কবিতার মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করে, তখন তিনি মুসলমানদের আত্মরক্ষার জন্য মদিনার কবিদের এগিয়ে আসতে বলেন।

হাসসান ইবনে সাবিত, কাব ইবনে মালেক ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ছিলেন নবীজির দরবারের শ্রেষ্ঠ তিন কবি।

আরও পড়ুন
কবিতা বা সাহিত্য মূলত মানুষের সাধারণ কথার মতোই একটি মাধ্যম মাত্র; কথা যেমন ভালো হলে তা প্রশংসনীয় এবং খারাপ হলে তা নিন্দনীয়, ঠিক একইভাবে কবিতার বিষয়বস্তু যদি সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে আহ্বান করে, তবে তা উত্তম; আর যদি তা অশ্লীলতা ও মিথ্যার প্রসার ঘটায়, তবে তা বর্জনীয়।
ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)

রাসুল (সা.) হাসসানকে বলতেন, ‘তুমি তাদের (কাফিরদের) কবিতার মাধ্যমে জবাব দাও, জিবরাইল তোমার সঙ্গে আছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২১৩)

শুধু তা-ই নয়, তিনি তাঁর জন্য মসজিদে নববিতে একটি বিশেষ মিম্বর স্থাপন করেছিলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন।

শিল্পমাধ্যম হিসেবে কবিতার মূল্যায়ন

ইসলাম সুন্দর কথা ও শব্দের শৈল্পিক গাঁথুনিকে মূল্যায়ন করে। রাসুল (সা.) কবিতার শক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতায় প্রজ্ঞা রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৪৫)

ইবনে হাজার আল-আসকালানি লিখেছেন, কবিতা বা সাহিত্য মূলত মানুষের সাধারণ কথার মতোই একটি মাধ্যম মাত্র; কথা যেমন ভালো হলে তা প্রশংসনীয় এবং খারাপ হলে তা নিন্দনীয়, ঠিক একইভাবে কবিতার বিষয়বস্তু যদি সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে আহ্বান করে, তবে তা উত্তম; আর যদি তা অশ্লীলতা ও মিথ্যার প্রসার ঘটায়, তবে তা বর্জনীয়। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ১০/৫৩৮, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

সুতরাং, কোরআনে কবিদের যে সমালোচনা করা হয়েছে, তা মূলত শিল্পের নামে মিথ্যার প্রসারকারীদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে রাসুল (সা.) মুমিন কবিদের যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা মূলত সত্য ও কল্যাণের পক্ষে তাঁদের বলিষ্ঠ শৈল্পিক প্রতিবাদের স্বীকৃতি।

আরও পড়ুন