রমজান মাস সংযম, ধৈর্য ও আত্মিক প্রশান্তির সময়। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, রোজা রাখা অবস্থায় আমাদের অনেকেরই মেজাজ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বিগড়ে যায়।
সামান্য কারণে তর্কে জড়ানো বা যানজটে আটকে থাকলে অসহিষ্ণু হয়ে পড়া যেন এক পরিচিত দৃশ্য।
কেন এমন হয়? এটি কি কেবলই ক্ষুধার তাড়না, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণ? আধুনিক ‘বিহেভিয়ারাল মেডিসিন’ বা আচরণগত চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞান (নিউরোসায়েন্স) এই প্রশ্নের চমৎকার কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘হ্যাঙ্গরি’ (Hangry - Hungry + Angry) বলা হয়, যা মূলত ক্ষুধা ও রাগের একটি সম্মিলিত অবস্থা।
রক্তে শর্করা ও মেজাজের জটিল রসায়ন
আমাদের মস্তিষ্কের শক্তির প্রধান উৎস হলো গ্লুকোজ বা শর্করা। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়। ‘নিউট্রিয়েন্টস’ নামক একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ আমাদের আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র। এই অংশটি সচল রাখতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ উপবাসের ফলে যখন শক্তির জোগান কমে আসে, তখন এই নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রটি শিথিল হয়ে পড়ে।
ফলে মানুষ দ্রুত উত্তেজিত বা রাগান্বিত হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘হ্যাঙ্গরি’ (Hangry - Hungry + Angry) বলা হয়, যা মূলত ক্ষুধা ও রাগের একটি সম্মিলিত অবস্থা।
ঘুমের অভাব: নেপথ্য কারণ
রমজান মাসে আমাদের জীবনযাত্রার রুটিন আমূল বদলে যায়। সাহ্রি খাওয়ার জন্য রাত জাগা, তারাবি এবং কাজের চাপে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বাধাগ্রস্ত হয়।
‘জার্নাল অব স্লিপ রিসার্চ’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, রমজানে ঘুমের সময় কমে যাওয়া বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া দিনের বেলা মেজাজ খিটখিটে হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’র সক্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। মস্তিষ্কের এই অংশটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডের জন্য দায়ী।
তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে লড়াই করতে চায়, তবে সে যেন বলে—আমি রোজাদার।সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৪
যখন অ্যামিগডালা বেশি সক্রিয় থাকে এবং প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স দুর্বল থাকে, তখন মানুষ ছোটখাটো বিষয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলে।
ক্যাফেইনের ‘উইথড্রয়াল সিম্পটম’
যাঁরা নিয়মিত চা-কফি পান করেন বা ধূমপানে অভ্যস্ত, রোজার প্রথম দিকে তাঁদের জন্য সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়। হঠাৎ ক্যাফেইন বা নিকোটিন গ্রহণ বন্ধ করে দিলে শরীরে ‘উইথড্রয়াল সিম্পটম’ বা প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ দেখা দেয়।
‘অ্যাডিক্টিভ বিহেভিয়ার্স রিপোর্টস’ সাময়িকীর তথ্যমতে, ক্যাফেইন ত্যাগ করার প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মনোযোগের অভাব এবং চরম বিরক্তি বোধ হতে পারে।
রমজানে প্রতিদিন এই চক্রটির পুনরাবৃত্তি ঘটে বলে অনেকের মেজাজ খিটখিটে থাকে।
সময়ের চাপ
জৈবিক কারণের পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত চাপও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। ইফতারের আগে কাজ শেষ করার তাড়াহুড়ো, যানজট এবং ঘরের কাজের বাড়তি চাপ শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
এই বাড়তি হরমোন মানুষকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে, যা রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রোজা কি আসলেও রাগ বাড়ায়?
মজার ব্যাপার হলো, সব গবেষণাই কিন্তু নেতিবাচক নয়।
‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ নামক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, যাঁরা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা থেকে রোজা রাখেন, তাঁদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বা ‘সেলফ-রেগুলেশন’ সাধারণের চেয়ে বেশি দেখা যায়।
অর্থাৎ, রোজা নিজে রাগ বাড়ায় না; বরং ঘুমের অভাব, পুষ্টির অসামঞ্জস্যতা এবং অভ্যাসের পরিবর্তনই এই অস্থিরতার জন্য দায়ী।
রমজানে দ্রুত রেগে যাওয়া কোনো রহস্যময় বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের জৈবিক ও স্নায়বিক পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক ফল। কিন্তু রমজানের মূল উদ্দেশ্যই হলো এই প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে জয় করা।
ধর্মীয় অনুশাসনে সমাধান
ইসলাম মেজাজ নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য ধারণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। রোজা কেবল পেট ক্ষুধার্ত রাখার নাম নয়, বরং জিহ্বা ও মনকে নিয়ন্ত্রণের সাধনা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “আর যারা রাগ দমনকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)
মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে রোজার সময় চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে শান্ত রাখতে হয়।
হাদিসে এসেছে, “তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে লড়াই করতে চায়, তবে সে যেন বলে—আমি রোজাদার।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৪)
রমজানে দ্রুত রেগে যাওয়া কোনো রহস্যময় বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের জৈবিক ও স্নায়বিক পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক ফল। কিন্তু রমজানের মূল উদ্দেশ্যই হলো এই প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে জয় করা।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট