কোরআন হিফজ করা কেবল একটি মানসিক কাজ নয়, এটি একটি আত্মিক সফর। এর জন্য প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাএবং মহান আল্লাহর বিশেষ তৌফিক।
কোরআনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারেকশন হিফজ করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেও অন্যের থেকে কোরআন শুনতে ভালোবাসতেন।
হিফজ শুরু করার আগে মনে রাখতে হবে, তাকওয়া বা খোদাভীতি হলো এর মূল ভিত্তি। গুনাহ মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। ইমাম হাসান বসরি (র.)-কে যখন একজন জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি কেন রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেন না, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তোমার গুনাহগুলো তোমাকে শিকলবন্দি করে রেখেছে।” (ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/৩৫০ পৃষ্ঠা, দারুল মাআরিফ সংস্করণ)
নিচে হিফজ করার ৭টি বিশেষ পরামর্শ তুলে ধরা হলো:
১. দক্ষ শিক্ষকের তত্ত্বাবধান
কোরআন কখনো একা একা কেবল ‘বই দেখে মুখস্থ’ করা উচিত নয়। একজন হাফেজ বা বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের কাছে পড়া অত্যন্ত জরুরি।
এটি আপনাকে অলসতা থেকে বাঁচাবে।
আপনার উচ্চারণ (মাখরাজ) ও তাজবিদ শুদ্ধ হওয়া নিশ্চিত করবে।
প্রচলিত আছে “যার কোনো শিক্ষক নেই, তার শিক্ষক শয়তান।” অর্থাৎ, ভুল পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
২. অল্প কিন্তু মজবুত হিফজ
একসঙ্গে অনেক বেশি মুখস্থ করার চেষ্টা না করে অল্প অল্প করে মুখস্থ করুন।
যদি আপনার একদিনে এক পৃষ্ঠা মুখস্থ করার ক্ষমতা থাকে, তবে আপনি অর্ধেক পৃষ্ঠা করুন। কিন্তু সেই অর্ধেক পৃষ্ঠা যেন অত্যন্ত মজবুত হয়।
মনে রাখবেন, প্রতিদিন একটি আয়াত মুখস্থ করে তা সারাজীবনের জন্য মনে রাখা, অনেকগুলো আয়াত মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়; যদিও তা পরিমাণে কম হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস:৬৪৬৫)
৩. বিরতিহীন ধারাবাহিকতা
হিফজের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বা কনসিস্টেন্সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করুন।
কোনো দিন যদি শিক্ষকের কাছে যেতে নাও পারেন, তবুও নিজে নিজে সেই দিনের নির্ধারিত অংশটুকু মুখস্থ করুন। এক দিনের বিরতি আপনার হিম্মত বা মনোবল কমিয়ে দিতে পারে।
৪. লিখে লিখে মুখস্থ করা
এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও পরীক্ষিত পদ্ধতি। আমাদের পূর্বসূরিরা কাঠের তক্তা বা স্লেটে লিখে কোরআন মুখস্থ করতেন।
কোনো অংশ মুখস্থ করার পর তা না দেখে খাতায় লিখুন।
লিখলে মস্তিষ্কের সাথে হাতের একটি সমন্বয় তৈরি হয়, যা পড়াটিকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে জমা করে।
৫. মনোযোগ দিয়ে শোনা
আপনি যে অংশটি মুখস্থ করছেন বা আগে করেছেন, তা দক্ষ কোনো কারির তেলাওয়াত থেকে বারবার শুনুন।
বর্তমান যুগে ডিজিটাল ডিভাইস বা অ্যাপ ব্যবহার করে এটি খুব সহজেই করা যায়।
বারবার শুনলে শব্দের সঠিক উচ্চারণ এবং তেলাওয়াতের সুর মাথায় গেঁথে যায়, যা হিফজ করাকে সহজ করে দেয়।
৬. নামাজে তেলাওয়াত করা
এটি মুখস্থ পড়া ধরে রাখার সবচেয়ে সেরা উপায়।
আপনি সারা দিনে যা মুখস্থ করেছেন, তা আপনার সুন্নাত ও নফল নামাজে তেলাওয়াত করুন।
যদি আপনি ইমামতি করেন, তবে সেখানেও তা পড়তে পারেন। নামাজে কোরআন পড়লে মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং পড়াটি অন্তরে প্রোথিত হয়।
৭. নিয়মিত পুনরাবৃত্তি বা মুরাজাআ
কোরআন মুখস্থ করার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো তা মনে রাখা। নিয়মিত রিভিশন বা মুরাজাআ ছাড়া হিফজ ধরে রাখা অসম্ভব।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা কোরআনের নিয়মিত চর্চা করো। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, এটি রশি ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়া উটের চেয়েও দ্রুত মানুষের অন্তর থেকে চলে যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৩৩)
তাই নতুন পড়ার চেয়ে পুরনো পড়া রিভিশন দেওয়ার জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখুন।
পরিশেষে, কোরআন হিফজ করা কেবল একটি অর্জন নয়, এটি আল্লাহর সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্কের শুরু। আপনার নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখুন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত সাহায্য চান।