বিপদে সুরক্ষা পেতে নবীজির শেখানো ৫ দোয়া

ছবি: পেক্সেলস

বিপদ ও সংকটের অন্ধকার রাতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্য লাভে মহানবী (সা.) উম্মতকে যে শক্তিশালী দোয়া ও আত্মিক সুরক্ষাকবচ শিখিয়ে গেছেন, তা মানবজীবনের এক অমূল্য পাথেয়।

ইবনুল কাইয়ুম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.) উল্লেখ করেছেন, “দোয়া হলো যাবতীয় বালা-মুসিবত দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি বিপদের আগমনকে প্রতিহত করে, চলমান বিপদকে হালকা বা দূর করে এবং বিপদ নেমে এলে তা প্রশমিত করে।” (আল-জাওয়াবুল কাফি লিমান সাআলা আনিদ দাওয়ায়িশ শাফি, দারু ইবনে কাসির, বৈরুত, পৃষ্ঠা: ২২–২৫)

১. আশাহীনতার মুখে চিরন্তন আশ্রয়

জীবনের সমস্ত বাহ্যিক দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায় এবং শত্রু বা প্রতিকূলতা যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে, তখন বিশ্বাসীর অন্তরে এক অলৌকিক সাহস জোগায় এই কোরআনিক দোয়াটি:

উচ্চারণ: “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।”

অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক ও কর্মবিধায়ক।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৩)

নবী ইব্রাহিম (আ.)-কে যখন নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন তাঁর মুখনিঃসৃত শেষ বাক্য ছিল এটি। আর ওহুদের যুদ্ধের কঠিনতম বিপর্যয়ের পর যখন মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদের সমূলে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছিল, তখন মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা এই বাক্যটিই পাঠ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৬৩)

আরও পড়ুন

২. আকস্মিক বিপর্যয়ের বর্ম

দৈনন্দিন জীবনে রোগবালাই, বিষাক্ত প্রাণীর দংশন, মানবীয় শত্রুতা কিংবা শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য নবীজি (সা.) এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যা সকাল ও সন্ধ্যায় পাঠ করলে কোনো কিছুই ব্যক্তির অনিষ্ট করতে পারে না।

উচ্চারণ: “বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা-ই, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।”

অর্থ: “সেই আল্লাহর নামে শুরু করছি, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না; আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮)

৩. মানসিক অস্থিরতায় নবীজির দোয়া

হৃদয়ের ওপর যখন শোকের কালো ছায়া নেমে আসে এবং দুশ্চিন্তায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন মহানবী (সা.) বিশেষ একটি দোয়ার মাধ্যমে রবের দরবারে শান্তি খুঁজতেন।

উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আযিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরদি ওয়া রব্বুল আরশিল কারিম।”

অর্থ: “মহামহিম ও পরম ধৈর্যশীল আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। মহান আরশের অধিপতি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আসমানসমূহ, জমিন এবং সম্মানিত আরশের মালিক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৪৫)

আরও পড়ুন

৪. ঋণের ভার ও পরনির্ভরতা মুক্তির জন্য

একবার মহানবী (সা.) মসজিদে নববীতে সাহাবি আবু উমামাকে বিষণ্ণ অবস্থায় বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার, নামাজের ওয়াক্ত ছাড়া তুমি মসজিদে বসে আছ কেন?’ তিনি বললেন, ‘দেনার বোঝা এবং মানসিক দুশ্চিন্তা আমাকে গ্রাস করেছে।’

তখন নবীজি (সা.) তাঁকে সকাল-সন্ধ্যায় দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দিলেন:

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়া আউযু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযু বিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখল, ওয়া আউযু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া ক্বাহরির রিজাল।”

অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা থেকে; আপনার আশ্রয় নিচ্ছি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে; আপনার আশ্রয় নিচ্ছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে; এবং আপনার আশ্রয় চাচ্ছি ঋণের অতিরিক্ত চাপ ও মানুষের অন্যায় দমন-পীড়ন থেকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯৩)

আবু উমামা (রা.) বলেন, “আমি নিয়মিত এই দোয়াটি পড়তে শুরু করলাম। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ-তাআলা আমার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণ ঋণমুক্তির ব্যবস্থা করে দিলেন।”

৫. সার্বিক সংশোধনের প্রার্থনা

মহানবী (সা.) নিজের কন্যা ফাতেমাকে একটি বিশেষ দোয়ার অসিয়ত করে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে যা নির্দেশ করছি তা শুনতে কিসে বাধা দেয়? তুমি সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়াটি পাঠ করবে:

উচ্চারণ: “ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যূম, বিরাহমাতিকা আস্তাগিস, আসলিহ লী শা’নী কুল্লাহু, ওয়ালা তাকিলনী ইলা নাফসী তারফাতা আইন।”

অর্থ: “হে চিরঞ্জীব, হে মহাবিশ্বের ধারক ও পরিচালক! আপনার রহমতের অসিলায় আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি; আপনি আমার সমস্ত বিষয় ও অবস্থাকে সুন্দর ও সংশোধন করে দিন; আর চোখের পলকের জন্যও আমাকে আমার নিজের প্রবৃত্তির ওপর ছেড়ে দেবেন না।” (সুনানে নাসায়ি কুবরা, হাদিস: ১০৩৩০)

আরও পড়ুন