কোরআনের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপি যেভাবে উদ্ধার করা হয়

ছবি: পেক্সেলস

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত প্রাচীন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক একাডেমিক জগতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই পাণ্ডুলিপিটি রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে, এটি সম্ভবত মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সমসাময়িক বা তাঁর ওফাতের পরপরই (৫৭০-৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) লিখিত কোনো অনুলিপির অংশ।

ইতিহাসের ধূলিজমা পাতা উল্টালে দেখা যায়, কোরআনের প্রাচীনতম লিপির এই অনুসন্ধান শুধু আধুনিককালের আবিষ্কার নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বিশ্বসভ্যতার এক অমূল্য রত্ন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

আদি আরবি প্রত্নলিপি

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপির আবিষ্কার ও কালক্রম নির্ধারণ নিয়ে আধুনিক প্রাচ্যবিদ ও পাণ্ডুলিপিশাস্ত্রীদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্য রয়েছে। গবেষক মনির ইউসুফ তাহা উল্লেখ করেছেন যে বার্মিংহামের এই দুই পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপিটি হিজরি প্রথম শতক বা মহানবীর জীবদ্দশার খুব কাছাকাছি সময়ের বার্তা বহন করে, যা ইসলামের একদম শুরুর দিকের লিখিত কোরআনিক পাঠের ঐতিহাসিক সত্যতাকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে। (মনীর ইউসুফ তাহা, আনাফ সাময়িকী, প্রথম সংখ্যা, পৃষ্ঠা: ৪৬, কাতার সংস্কৃতি বিভাগ, দোহা, কাতার, ২০১৫)

পাশাপাশি হিজরি প্রথম শতকে আরবি ভাষার লিখিত প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবহার কতটা সুসংহত ছিল, তার প্রমাণ মেলে মিসরে পাওয়া প্রাচীন প্যাপিরাসে। মিসরে হিজরি ২২ সালে (৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) দুটি আরবি প্যাপিরাস আবিষ্কৃত হয়েছে—যার একটি রাজস্ব বা কর সংগ্রহের হিসাব সংক্রান্ত এবং অপরটি গ্রিক-আরবি দ্বিভাষিক রসিদ, যেখানে মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য ভেড়া সরবরাহের বিবরণ রয়েছে।

আরও পড়ুন

এটি প্রমাণ করে যে ইসলামের সূচনালগ্নেই একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক ও লিখিত ভাষার বিকাশ ঘটেছিল। (মাহের আহমেদ ঈসা, রেওয়াক আল-তারিখ ওয়াল-তুরাস সাময়িকী, প্রথম সংখ্যা, পৃষ্ঠা: ১৩৪, ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষণা কেন্দ্র, দোহা, কাতার, ২০১৬)

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, প্রথম হিজরি শতকেই কোরআনের লিপি ও লিখিত দলিল অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা শুরু হয়েছিল।

সমরখন্দ মুসহাফ ও সেন্ট পিটার্সবার্গের পাণ্ডুলিপি

কোরআনের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধানে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক নগরী সমরখন্দে। সেখান থেকে প্রাচীন কোরআনের একটি বিরল ও সুবিশাল পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীকালে রুশ সাম্রাজ্যের তুর্কিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কার্ল ফন কফম্যান এই বিরল পাণ্ডুলিপিটি সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরিতে স্থানান্তর করেন।

মিসরে কায়রো থেকে প্রকাশিত ঐতিহাসিক সাময়িকী আল-ইখা-র ১৯২৮ সালের একটি বিশেষ আর্কাইভভিত্তিক প্রতিবেদনে এই পাণ্ডুলিপির ইতিহাস বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সমরখন্দের এই পাণ্ডুলিপিটি মূলত ১৪০৩ খ্রিষ্টাব্দে এশিয়া মাইনরের এক আলেম বিখ্যাত তুর্কিস্তানী বুজুর্গ খাজা আহরারকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে শাসক তৈমুর লং এটি মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তানে নিয়ে আসেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বহু শতাব্দী ধরে এই পাণ্ডুলিপিটি খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নিজস্ব হস্তলিখিত মূল ‘মসহাফ-ই উসমানী’ হিসেবে খ্যাত ছিল। (আলী আফিফি আলী গাজী, আল-ইখা সাময়িকী, ৫ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা, পৃষ্ঠা: ৬৪১-৬৪২, দারুল ইখা, কায়রো, মিসর, ১৯২৮)

রুশ ইম্পেরিয়াল আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির গবেষক ও লিপিবিশারদ অধ্যাপক শেবুতিন সমরখন্দের এই পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পাণ্ডুলিপিটি হিজরি প্রথম শতকে বা বড়জোর হিজরি দ্বিতীয় শতকের (৭৩২-৮১৪ খ্রিষ্টাব্দ) সূচনা লগ্নে লিখিত। ফলে প্রাচীন আরবি ক্যালিগ্রাফি, লিখনরীতি এবং প্রারম্ভিক হিজরি যুগের লিপি-পদ্ধতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত পায়।

বলশেভিক বিপ্লবের ট্র্যাজেডি

ইতিহাসের নির্মম পরিণতি কখনো কখনো অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের ঝড়ো দিনগুলোতে রুশ সাম্রাজ্যের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় অধিকার হিসেবে সেন্ট পিটার্সবার্গে রাখা এই ঐতিহাসিক উসমানী পাণ্ডুলিপিটি ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়।

দাবির মুখে তৎকালীন প্রশাসন পাণ্ডুলিপিটি তুর্কিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করে।

আরও পড়ুন

দুঃখজনক বিষয় হলো, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে তুর্কিস্তানে স্থানান্তরের দীর্ঘ পথযাত্রার কোনো এক অজানা স্থানে এই ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়! পরে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের শত অনুসন্ধানের পরও এর আর কোনো সুনির্দিষ্ট সন্ধান মেলেনি। বিশ্বসভ্যতা ও পাণ্ডুলিপিশাস্ত্রের জন্য এটি ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।

তবে এই বিরাট ক্ষতির মাঝেও একটি বড় সান্ত্বনা ও ঐতিহাসিক উদ্ধারকাজ সংরক্ষিত থেকে যায়। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের কয়েক বছর আগে, ১৯০৪ সালের ২৬ মে সেন্ট পিটার্সবার্গের আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির তত্ত্বাবধানে এবং সোসাইটির পরিচালকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনক্রমে এই মূল পাণ্ডুলিপিটির একটি হুবহু ফ্যাঙ্কসিমিলি বা আলোকচিত্রভিত্তিক রঙিন প্রতিলিপি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

১৯০৫ সালের বিরল ফ্যাঙ্কসিমিলি সংস্করণ

আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির অনুমতিক্রমে বিশিষ্ট রাশিয়ান প্রাচ্যবিদ এস. পিসারেভ ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট পিটার্সবার্গে নিখুঁতভাবে এই প্রতিলিপিটি মুদ্রণ করেন।

পুনঃমুদ্রণ প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে ১৯২৮ সালের সেই আর্কাইভে বলা হয়েছে, মূল পাণ্ডুলিপির প্রতিটি আয়াতের বিরতি, লিপির হরফ এবং মূল রঙের সূক্ষ্ম তারতম্য বজায় রেখে এটি প্রকাশ করা হয়েছিল। ৩৫৩ পৃষ্ঠার এই বিশালাকার গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠার পরিমাপ ছিল ৬৯ × ৯০ সেন্টিমিটার এবং একেকটি বাঁধাই করা সংস্করণের ওজন ছিল প্রায় ১৮ কেজি।

অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও মজবুত বাঁধাইয়ের এই বিশেষ প্রতিলিপিটি তৎকালীন সময়ে মাত্র ৫০টি কপি প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৫টি কপি গবেষক ও রাজকীয় সংগ্রহশালার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয় এবং বাকি ২৫টি কপি সর্বসাধারণের বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়—যার প্রতিটির তৎকালীন বিক্রিমূল্য ছিল ১০০ পাউন্ড। (আলী আফিফি আলী গাজী, আল-ইখা সাময়িকী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪২, কায়রো, মিসর, ১৯২৮)

এই ফ্যাঙ্কসিমিলি সংস্করণের প্রথম পৃষ্ঠায় রুশ ও ফরাসি ভাষায় স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, সমরখন্দের পবিত্র কোরআন, যা খলিফা উসমান (৬৪৪-৬৬৫ খ্রি.) এর মূল হস্তলিখিত কপি থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরির সহায়তায় ১৯০৫ সালে হুবহু প্রতিচ্ছবি হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে।”

  • সূত্র: ইসলাম অনলাইন ডটকম

আরও পড়ুন