রমজান মাস আমাদের মাঝে এক বিশেষ মেহমান হিসেবে আসে। কোনো বিশেষ মেহমান বাড়িতে আসার আগে আমরা যেমন ঘরদোর পরিষ্কার করি, আপ্যায়নের প্রস্তুতি নেই, রমজানও তেমনি আমাদের হৃদয়ে পদার্পণ করে। তাই এই বরকতময় মাস আসার আগেই আমাদের অন্তরকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
আপনি প্রথমবার রোজা রাখছেন বা সারা জীবন ধরে রাখছেন—যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি রমজানই আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নবায়নের এক অনন্য সুযোগ। নিচে রমজানের জন্য আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়ার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ উপায় তুলে ধরা হলো।
১. নিয়ত বা সংকল্প শুদ্ধ করা
ইসলামে প্রতিটি কাজের ভিত্তি হলো নিয়ত। আপনি কী করছেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কেন করছেন এবং কার জন্য করছেন।
তাকওয়া অর্জন: আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
সচেতনতা: প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি যা করছি তাতে কি আল্লাহ খুশি হবেন?’ এই সচেতনতাই হলো তাকওয়া।
নিয়ত নবায়ন: রমজান আসার আগেই মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করুন এবং প্রতিদিন রাতে আপনার নিয়তকে ঝালাই করে নিন।
২. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা
রমজান হলো কোরআনের মাস। তাই রমজান আসার অপেক্ষা না করে আজ থেকেই কোরআন পাঠ শুরু করুন।
পরিমাণের চেয়ে মান: কেবল খতম দেওয়ার জন্য দ্রুত না পড়ে, প্রতিদিন ১০ মিনিট সময় নিয়ে অর্থসহ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন।
হৃদয়ের তালা খোলা: আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ে তালা লাগানো রয়েছে?’ (সুরা মুহাম্মদ আয়াত: ২৪)
ব্যক্তিগত সংযোগ: কোরআন পড়ার সময় অনুভব করার চেষ্টা করুন যে মহান আল্লাহ সরাসরি আপনাকে সম্বোধন করছেন। প্রয়োজনে কোনো অ্যাপ ব্যবহার করুন যা আপনাকে প্রতিদিন কোরআন পড়ার কথা মনে করিয়ে দেবে।
৩. নফল রোজা ও দোয়া
রমজান আসার আগে শাবান মাসে কিছু নফল রোজা রাখা সুন্নাত। এটি আপনাকে দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত করবে এবং আপনার ‘নফস’ বা কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করবে।
দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া: দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। এর জন্য অজুর বা বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই; যেকোনো সময় যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর কাছে চাওয়া যায়।
উম্মাহর জন্য দোয়া: নিজের জন্য চাওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। রমজান থেকে যেন সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ফায়দা হাসিল করতে পারেন, সেই তৌফিক চান।
৪. নামাজে একাগ্রতা বাড়ানো
কিয়ামতের দিন নামাজের হিসাব হবে সবার আগে। যদি আপনার নামাজ ঠিক থাকে, তবে ইমান রক্ষা পাওয়া সহজ হবে।
শেষ নামাজ মনে করা: প্রতিটি নামাজ পড়ার আগে ভাবুন, এটিই হয়তো আপনার জীবনের শেষ নামাজ।
ধীরস্থিরতা: তাড়াহুড়ো না করে নামাজের প্রতিটি রুকন ও তাসবিহগুলো ধীরস্থিরভাবে আদায় করুন।
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি: নামাজের মাঝে অন্য চিন্তা আসলে বা শয়তানের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) বোধ করলে মনে মনে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন। আজ থেকে নামাজের মান উন্নত করলে রমজানের তারাবিহ ও নফল নামাজগুলো আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
৫. আচরণের সংশোধন
আমাদের রোজা কেবল না খেয়ে থাকা নয়। যদি আমাদের আচরণ বা আদব সুন্দর না হয়, তবে সেই রোজার আধ্যাত্মিক মূল্য কমে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা বর্জন করেনি, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’ (সহিহ বুখারি ৬০৫৭)।
রাগ নিয়ন্ত্রণ: আপনার যদি অল্পতেই রেগে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে আজ থেকেই তা নিয়ন্ত্রণের প্র্যাকটিস শুরু করুন।
মুখের হেফাজত: গিবত (পরনিন্দা), মন্দ কথা এবং মিথ্যা থেকে জবানকে পবিত্র রাখুন।
নবীজির আদর্শ: রাসুলুল্লাহ (সা.) কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং রাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন, তা নিয়ে পড়াশোনা করুন।
রমজানের প্রস্তুতির জন্য খুব বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের দৈনন্দিন ইবাদতের মৌলিক বিষয়গুলোতে (সততা, মনোযোগ, নিয়ত ও সুন্দর আচরণ) ফিরে আসাই হলো আসল প্রস্তুতি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থতার সঙ্গে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন এবং আমাদের সকল ইবাদত কবুল করুন। আমিন।