পবিত্র কোরআনে বহু জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী ইতিহাসও রয়েছে, সেটি হলো নবী ইউনুসের সম্প্রদায়ের ঘটনা।
তারা প্রথমে আল্লাহর নবীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু আজাবের লক্ষণ নিজ চোখে দেখার পর সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তাদের অনুতাপ ছিল অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত, তওবাও ছিল পরিপূর্ণ আন্তরিক। ফলে আল্লাহ তাদের ওপর থেকে পার্থিব শাস্তি প্রত্যাহার করে নেন।
নবী ইউনুস ও নিনেভার জনগণ
ইউনুস (আ.) ছিলেন বনি ইসরাইলের একজন সম্মানিত নবী। আল্লাহ তাঁকে ইরাকের ঐতিহাসিক নগরী নিনেভার অধিবাসীদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। সে সময় নিনেভা ছিল সমৃদ্ধ জনপদ, কিন্তু তাদের জীবন ছিল শিরক ও নৈতিক অবক্ষয়ে পরিপূর্ণ। তারা মূর্তিপূজার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
আকাশের রং অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, চারদিকে ভয়ের আবহ সৃষ্টি হয় এবং এমন কিছু আলামত প্রকাশ পায়, যা দেখে সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নবীর সতর্কবাণী সত্য ছিল।
নবী তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেন। তিনি বুঝিয়ে বলেন, মানুষের সৃষ্টি, জীবন, মৃত্যু ও রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা সবচেয়ে বড় জুলুম।
অধিকাংশ মানুষ তাঁর আহ্বানকে উপহাস করে এবং পূর্বপুরুষের ধর্ম আঁকড়ে ধরে সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ইউনুসকেও অন্যান্য নবী-রাসুলের মতো বিরোধিতা, বিদ্রূপ ও অবাধ্যতার মুখোমুখি হতে হয়।
অবশেষে তিনি তাদের থেকে পরিপূর্ণ নিরাশ হয়ে বলেন, ‘তিন দিনের মধ্যেই তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে।’ এ সতর্কবার্তার পর ইউনুস (আ.) নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যান। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৪/৩৪৫-৩৪৬, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)
নবীর প্রস্থানের পর আজাবের আলামত
ইউনুস (আ.) চলে যাওয়ার পর নিনেভার মানুষজন প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা ভেবেছিল, আগের মতো এটিও স্রেফ একটি সতর্কবার্তা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।
আকাশের রং অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, চারদিকে ভয়ের আবহ সৃষ্টি হয় এবং এমন কিছু আলামত প্রকাশ পায়, যা দেখে সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নবীর সতর্কবাণী সত্য ছিল।
আজাবের ভয়াবহ লক্ষণ চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠতেই নিনেভার অধিবাসীদের হৃদয়ে প্রচণ্ড আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এত দিন সত্যকে অস্বীকারকারীরাই এবার উপলব্ধি করতে শুরু করে, তারা বড় ভুল করেছে।
যে নবীকে এত দিন অবজ্ঞা করা হয়েছিল, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলেননি; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকেই সতর্ক করেছিলেন।
যখন তারা ইমান এনেছিল, আমি তাদের ওপর থেকে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি সরিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের কিছু সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিয়েছিলাম।কোরআন, সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৮
এই পর্যায়ে তাদের মানসিক অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এত দিন শাস্তিকে অসম্ভব মনে করা মানুষগুলো এবার নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে শুরু করে। অহংকারের জায়গায় আসে ভয়, অবহেলার স্থানে আত্মসমালোচনা।
বস্তুত নিজের ভুল স্বীকার করার মধ্য দিয়েই তো তওবার পথ উন্মুক্ত হয়। নিনেভার অধিবাসীদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছিল।
এ সময় সমাজের জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সবাইকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান। সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, পরস্পরকে দোষারোপ করে আর কোনো লাভ নেই, মুক্তির একমাত্র পথ আল্লাহর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এই উপলব্ধি নিনেভার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পরবর্তী ঘটনায় এমন এক নজির স্থাপিত হয়, যার কথা আল্লাহ কোরআনে চিরস্থায়ী শিক্ষা হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৪৬২-৪৬৩, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)
ইতিহাসের বিরল সমষ্টিগত তওবা
নিনেভার অধিবাসীরা শহরের বাইরে সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও ফরিয়াদ করতে থাকে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই আন্তরিকভাবে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারা নিজেদের পশু ও সেগুলোর বাচ্চাদেরও আলাদা করে দেয়, যাতে অসহায় প্রাণীদের আহাজারিও আল্লাহর রহমত লাভের একটি উপলক্ষ হয়।
আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের ওপর থেকে নির্ধারিত আজাব সরিয়ে দেন। (বাগাবি, মাআলিমুত তানজিল, ৪/১৫২, দারে তাইবাহ, রিয়াদ, ১৪১১ হিজরি)
কোরআন তাদের এই অবস্থা তুলে ধরে বলেছে, ‘তবে ইউনুসের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোনো জনপদ কি এমন ছিল না, যারা ইমান এনেছে এবং তাদের ইমান তাদের উপকারে এসেছে? যখন তারা ইমান এনেছিল, আমি তাদের ওপর থেকে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি সরিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের কিছু সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিয়েছিলাম।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৮)
কোরআনের এ ঘটনা মুসলমানদের জন্য আশার বার্তা। বান্দা যত ভুল করুক, যদি সে আন্তরিকভাবে ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। তবে তওবা হতে হবে সত্যিকারের। কারণ, মুখে ক্ষমা চাওয়া আর অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়ার মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে।
পার্থক্যটি ছিল তাদের শেষ সিদ্ধান্তে। অন্য জাতিগুলো যখন সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নিজেদের অহংকার ও অবাধ্যতায় অটল ছিল, তখন নিনেভার মানুষ অহংকার ত্যাগ করে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
অন্য জাতির সঙ্গে কওমে ইউনুসের পার্থক্য
পবিত্র কোরআনে বহু জাতির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে, যারা নবীদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল। তবে ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা এসব ঘটনার তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
পার্থক্যটি ছিল তাদের শেষ সিদ্ধান্তে। অন্য জাতিগুলো যখন সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নিজেদের অহংকার ও অবাধ্যতায় অটল ছিল, তখন নিনেভার মানুষ অহংকার ত্যাগ করে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতা আসার পর মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে, অহংকার আঁকড়ে ধরা অথবা বিনয়ের সঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করা। নিনেভার মানুষ দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিল। তাই তারা ধ্বংসের পরিবর্তে আল্লাহর রহমত লাভ করেছিল।
নিনেভার মানুষ যেভাবে অহংকার ছেড়ে বিনম্র হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরেছিল, প্রত্যেক মুমিনের জীবনে সেই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। ভুল স্বীকার করা আর সত্যিকারের অনুশোচনা নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুক্তির একমাত্র পথ।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।