ফজরের নামাজের অনন্য ৭ ফজিলত

ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা খাঁটি ইমানদার হওয়ার বড় প্রমাণছবি: পেক্সেলস

মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরের নামাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। দিন শুরুর এই বিশেষ ইবাদতটির প্রতি মহান আল্লাহ এতই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, পবিত্র কোরআনের একটি সুরায় তিনি সময়ের শপথ করতে গিয়ে বলেছেন, “শপথ ফজরের।” (সুরা ফাজ্‌র, আয়াত: ১-২)

ফজরের নামাজের এই বিশেষত্বের মূল কারণ সম্ভবত এর সময়কাল। যখন সারা বিশ্ব গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, আরামদায়ক শয্যা ত্যাগ করা যখন মানুষের জন্য সবচাইতে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন একজন মুমিন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শয্যা ত্যাগ করেন।

কষ্টের তীব্রতা যেখানে বেশি, সেখানে পুরস্কারের পরিমাণও যে অধিক হবে—এটিই শরিয়তের নিয়ম।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমার কষ্টের মাত্রা অনুযায়ী তোমার প্রতিদান নির্ধারিত হবে।” (ইমাম হাকেম নিশাপুরি, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, ১/৪৭২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)

ফজরের কয়েকটি মর্যাদার দিক নিচে আলোচনা করা হলো।

১. দুনিয়া ও আখিরাতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ

ফজরের ফরজ নামাজের গুরুত্ব তো অপরিসীম, এমনকি এর আগে যে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ পড়া হয়, তার মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চেয়েও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২৫)

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, এই দুই রাকাত নামাজ আমার কাছে গোটা দুনিয়ার চেয়েও বেশি প্রিয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) সফর কিংবা বাড়িতে অবস্থান—কোনো অবস্থাতেই এই সুন্নাত ত্যাগ করতেন না।

২. আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় থাকা

একজন মানুষ যখন ফজরের নামাজ আদায় করেন, তিনি সেই মুহূর্ত থেকে মহান আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তায় চলে যান। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে চলে গেল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৭)

আরও পড়ুন
রাতের ফেরেশতা এবং দিনের ফেরেশতারা ফজরের নামাজের সময় একত্র হন এবং নামাজিদের সঙ্গে জামাতে শরিক হন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭১৭

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি বলেন, “আল্লাহর জিম্মাদারিতে থাকার অর্থ হলো তাঁর নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে থাকা। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ল, সে যেন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করল এবং আল্লাহ তাকে সেই আশ্রয় দান করলেন। সুতরাং কোনো ব্যক্তির জন্য এটি শোভনীয় নয়, সে আল্লাহর আশ্রিত কোনো ব্যক্তিকে কষ্ট দেবে। যদি কেউ এমনটি করে, তবে আল্লাহ তার কাছে এর প্রতিবিধান চাইবেন।” (ইমাম কুরতুবি, আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম, ২/২৮২, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৬)

৩. ফেরেশতাদের উপস্থিতির সময়

ফজরের নামাজ কেবল মুমিনের ইবাদত নয়, বরং এটি আসমানি ফেরেশতাদের এক অনন্য মিলনমেলা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ভোরের নামাজ আদায় করো; নিশ্চয়ই ভোরের নামাজ হলো উপস্থিতির সময়।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৮)

আল্লাহর রাসুল (সা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, রাতের ফেরেশতা এবং দিনের ফেরেশতারা ফজরের নামাজের সময় একত্র হন এবং নামাজিদের সঙ্গে জামাতে শরিক হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭১৭)

আল্লামা নাসির আস-সা’দি বলেন, “ফজরের নামাজকে কোরআনে ‘কুরআনাল ফাজর’ বা ভোরের পঠন বলেছেন, কারণ এই নামাজে কিরাত দীর্ঘ করা মোস্তাহাব। আর এই নামাজের সময় আল্লাহ এবং রাত ও দিনের ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন বলে একে ‘মাশহুদা’ বা উপস্থিতির সময় বলা হয়েছে।” (আবদুর রহমান ইবনে নাসির আস-সা’দি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, পৃষ্ঠা: ৪৬৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)

৪. কেয়ামতের কঠিন দিনে পূর্ণ নুর

যারা অন্ধকার ঠেলে মসজিদের দিকে হেঁটে যায়, তাদের জন্য রাসুল বলেছেন, “রাতের অন্ধকারে মসজিদের দিকে পায়ে হেঁটে গমনকারীদের কেয়ামতের দিন পূর্ণ নুরের সুসংবাদ দাও।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫৬১)

যেহেতু তারা দুনিয়াতে অন্ধকারের কষ্ট সহ্য করে আল্লাহর ঘরে গিয়েছে, তাই আল্লাহ এর বিনিময়ে তাদের পরকালে এমন আলো দেবেন যা তাদের পুলসিরাত ও হাশরের ময়দান পার হতে সাহায্য করবে।

সারা রাত জেগে নামাজ পড়ার চেয়ে আমার কাছে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা বেশি প্রিয়।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)
আরও পড়ুন

৫. জান্নাতের নিশ্চয়তা

ফজরের নামাজ নিয়মিত আদায় করা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার অন্যতম ঢাল। রাসুল (সা.) বলেছেন, “সূর্যোদয়ের আগের (ফজর) এবং সূর্যাস্তের আগের (আসর) নামাজ যে ব্যক্তি আদায় করবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩৪)

অন্য একটি বর্ণনায় এই দুই সময়ের নামাজকে ‘বারদাইন’ বা দুই শীতল সময়ের নামাজ বলা হয়েছে এবং এর পুরস্কার হিসেবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৮)

৬. মোনাফেকি থেকে মুক্তির সনদ

ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা একজন মানুষের খাঁটি ইমানদার হওয়ার বড় প্রমাণ। কারণ, মোনাফেকদের কাছে এই নামাজটি সবচাইতে কষ্টকর মনে হয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “মোনাফেকদের জন্য ফজর ও ইশার নামাজের চেয়ে অধিক ভারী আর কোনো নামাজ নেই। তারা যদি জানত এই দুই নামাজের মধ্যে কী (পুরস্কার) রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এতে শরিক হতো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৭)

৭. সারা রাত নফল নামাজের সওয়াব

ফজরের জামাতে শরিক হওয়া মানে কেবল একটি ওয়াক্ত আদায় করা নয়, বরং এটি সারা রাত ইবাদত করার সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাতে পড়ল, সে যেন অর্ধেক রাত নফল নামাজ পড়ল। আর যে ফজরের নামাজ জামাতে পড়ল, সে যেন সারা রাত নামাজ পড়ল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৬)

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের একটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। একবার তিনি ফজরের জামাতে সুলায়মান ইবনে আবি হাসমা নামক এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন না। বাজারে যাওয়ার পথে সুলায়মানের মা শিফার কাছে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “সুলায়মানকে তো ফজরের জামাতে দেখলাম না?” মা উত্তর দিলেন, “সে সারা রাত নফল নামাজ পড়েছে, তাই ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল।”

তখন ওমর (রা.) বললেন, “সারা রাত জেগে নামাজ পড়ার চেয়ে আমার কাছে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা বেশি প্রিয়।” (ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা, হাদিস: ৪৩৬; আবদুর রাজ্জাক সানআনি, আল-মুসান্নাফ, হাদিস: ২০৫৩)

আরও পড়ুন