আমাদের দৃষ্টিতে প্রায়ই মনে হয়, দৃশ্যমান আমলই একমাত্র ইবাদত। আমরা এসব আমলকে বেশি গুরুত্ব দিই এবং এগুলোর পালনকেই প্রকৃত মুমিনের পরিচায়ক গণ্য করি। কখনও কাউকে এসব কাজে যত্নবান দেখলে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও প্রকাশ করি।
কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট হয়, ইবাদত কেবল দৃশ্যমান আমলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন বহু আমল রয়েছে, যা মানুষের চোখে পড়ে না, অথচ আল্লাহ তাআলার কাছে সেগুলোর মূল্য অপরিসীম। এসব আমলই মূলত ‘নীরব আমল’,যা শব্দহীন, প্রচারহীন; কিন্তু গভীর, আন্তরিক এবং স্থায়ী প্রভাবসম্পন্ন।
এমন কয়েকটি আমলের কথা উল্লেখ করা হলো।
একান্তে আল্লাহর ভয়
নীরব আমলের প্রথম ও ভিত্তিমূলক স্তর হলো,একান্তে আল্লাহকে ভয় করা। মানুষ যখন জনসমক্ষে থাকে, তখন অনেকেই গুনাহ থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু প্রকৃত আল্লাহভীতি (তাকওয়া) তখনই প্রকাশ পায়, যখন কেউ একা থাকেন, কোনো নজরদারি নেই, তবু তিনি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করেন না। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে আল্লাহর কাছে মানুষের একান্ত মুহূর্তের মূল্য অপরিসীম। মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ; কিন্তু আল্লাহর নজর এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। এই বিশ্বাসই নীরব তাক্বওয়ার জন্ম দেয়।
গোপনে সদকা করা
দান-সদকা কেবল আর্থিক সহায়তাই নয়; এটি নৈতিক ও চিন্তাশীল মনোভাবের প্রকাশ। যখন দান গোপনে করা হয়, তখন তা হয় অহংকারমুক্ত এবং নিয়ত থাকে পরিশুদ্ধ। এটি শেখায়, মানবসেবায় এগিয়ে আসতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, প্রশংসা বা সুনাম অর্জনের জন্য নয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন,’তোমরা যদি দান প্রকাশ্যে দাও, তাহলে ভালো; আর যদি গোপনে অসচ্ছলদের দাও, তাহলে তোমাদের জন্য উত্তম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭১)
প্রকাশ্য দানের ফলে অনেক সময় দানগ্রহীতার মনে কুণ্ঠাবোধ সৃষ্টি হয়। আবার কখনও তা রিয়া তথা লোকদেখানো আমলের দিকে নিয়ে যায়, যা ইসলামে ছোট শিরক হিসেবে বিবেচিত। এ কারণে কাউকে না জানিয়ে, নিঃশব্দে দান করাই উত্তম। এতে যেমন অন্তর বিশুদ্ধ থাকে, তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ণ প্রতিদানেরও আশা করা যায়।
নির্জনে আল্লাহর স্মরণ
নির্জন নীরবতায় মুমিন যখন একান্তে আল্লাহকে স্মরণ করেন, তখন তা হয় গভীরতম ইবাদত। এ সময় আল্লাহর জিকির অন্তরকে জীবিত করে এবং বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে অগ্রসর করে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষকে মহান আল্লাহ আরশের নিচে স্থান দিবেন… এবং যিনি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে কেঁদেছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৮০৬)
এই স্মরণ কোনো লৌকিকতা বা প্রদর্শনীর জন্য নয়; বরং রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণের এক অনন্য নিদর্শন। এতে প্রকাশ পায় বান্দার আল্লাহভীতি, অন্তরের কোমলতা এবং নিজের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করে ফিরে আসার আন্তরিক আকুলতা।
অগোচরে অপরের জন্য দোয়া
মুনাজাতে অপরের জন্য কল্যাণ চাওয়া নীরব আমলের মহৎ রূপ। এতে নেই প্রচার, নেই প্রত্যাশা; আছে শুধু আল্লাহর কাছে নিখাদ ও আন্তরিক নিবেদন। যাকে নিয়ে দোয়া করা হয়, তিনি জানেন-ই না। কিন্তু আল্লাহ সবই জানেন। এই দোয়া অন্তরের পবিত্রতা ও প্রকৃত ইমানি ভ্রাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি অগোচরে অপর ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে তা বিফলে যায় না।’ (মুসনাদে বাজজার, হাদিস: ৩,৫৭৭)
দোয়ার মুহুর্তে মা-বাবা, পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে সবার জন্যই রয়েছে বিশেষ কল্যাণ। যার জন্য দোয়া করা হয়, তার জন্য রহমতের দরজা উন্মুক্ত হয়; আর যিনি দোয়া করেন, ফেরেশতার ‘আমিন’–এর মাধ্যমে তার জীবনও বরকতে ভরে ওঠে।
সব দুঃখ প্রকাশ না করা
জীবন সবসময় সমতল পথে চলে না। বিপদ, হতাশা ও অস্থিরতা মানুষের অন্তরকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এমন সময় প্রকৃত মুমিন তার সকল ব্যথা ও কষ্ট মানুষের কাছে উজাড় করে দেন না; বরং তিনি তা হৃদয়ে ধারণ করেন এবং একান্তভাবে আল্লাহর কাছেই নিবেদন করেন। নবী ইয়াকুব (আ.) প্রিয় সন্তান হারানোর গভীর বেদনাতেও বলেন, ‘আমি আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করি।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬)
এই বাক্য নীরব সবরের এক অনন্য ও সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। এখানে নেই কোনো অভিযোগ, নেই হতাশা; আছে শুধু আল্লাহর ওপর অটুট ভরসা। এমন সবর মানুষকে ভেতর থেকে মজবুত করে এবং আল্লাহর সাহায্যকে নিকটবর্তী করে।
নীরব আমল মানুষের প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল নয়। এগুলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্কের ফসল। হয়তো মানুষ জানবে না, সমাজ মূল্যায়ন করবে না; কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব নীরব ইবাদতই বান্দার আমলের পাল্লা ভারী করবে।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক