সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল নিউজ: মুমিনের ৬ করণীয়

ছবি: পেক্সেলস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কন্টেন্ট (আধেয়) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মে প্রভাব ফেলছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাইরাল কোনো সংবাদ, ছবি বা ভিডিও এবং তা নিয়ে বিতর্ক এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো কন্টেন্টের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, একজন মুমিনের জন্য তা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।

ভার্চুয়াল মাধ্যমে মিথ্যার পরিণতি 

এ যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু শেয়ার করা মানে অন্যের কথা প্রচার করা। স্ট্যাটাস দেওয়া মানে জনসমক্ষে নিজের মত জানানো। কারও পোস্ট বা ছবিতে মন্তব্য করা আর বাস্তবে কারও সম্পর্কে মন্তব্য করা একই কথা।

ফলে কথা বলা, দেখা ও প্রচার করা নিয়ে কোরআন-হাদিসে যে নির্দেশনা আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও তা-ই প্রযোজ্য।

বরং বাস্তব জীবনের মিথ্যার চেয়ে অনলাইনে এই জগতের মিথ্যা বেশি ক্ষতিকর। কারণ তা অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং দীর্ঘদিন থেকে যায়।

মহানবী (সা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তির শাস্তি দেখেছিলেন, যার মিথ্যা মানুষ বহন করে নিয়ে যেত এবং তা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ত। কেয়ামত পর্যন্ত তাকে এই শাস্তি দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৬)

হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো।
সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬
আরও পড়ুন

মুমিনের ৬ করণীয়

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কন্টেন্ট সামনে এলে তাতে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা তা নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

  • প্রথমত, ইসলামে যা দেখা নিষিদ্ধ, তা থেকে বিরত থাকা। কোরআনে মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)

    বাস্তবে যা দেখা নিষেধ, মোবাইলের স্ক্রিনেও তা দেখা নিষেধ। অশ্লীল ছবি বা নাচের ভিডিও এর মধ্যে পড়ে। একইভাবে এ ধরনের কন্টেন্ট প্রচার করে এমন ব্যক্তি বা পেজকে ফলো করা ও লাইক দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।

    কারণ লাইক ও ফলোর মাধ্যমে সেই কন্টেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। আল্লাহ বলেছেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে তোমরা একে অন্যকে সাহায্য কোরো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

  • দ্বিতীয়ত, নেতিবাচক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু শেয়ার না করা। যে কন্টেন্টে কোনো কল্যাণ নেই, তা শেয়ার করারও দরকার নেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অনর্থক বিষয় ছেড়ে দেওয়া মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)

  • তৃতীয়ত, প্রতারণামূলক পোস্ট না দেওয়া। লাইক, কমেন্ট বা ভিউ বাড়ানোর জন্য অনেকে ভুল শিরোনাম বা বানানো তথ্য দিয়ে পোস্ট দেন। এটা প্রতারণা। 

    মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)

  • চতুর্থত, এক্সপোজের নামে অন্যের দোষ প্রচার না করা। হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

    একইভাবে ফ্লেক্স, অর্থাৎ নিজের সম্পদ, সাফল্য বা ইবাদত দেখিয়ে বেড়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে। কারণ মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো কাজ করাই রিয়া।

    হাদিসে এসেছে, যে মানুষকে শোনানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার আসল অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন, আর যে দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার আসল অবস্থা দেখিয়ে দেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৯)

  • পঞ্চমত, কমেন্টে গালাগালি বা কটুকথা না বলা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি (পাপাচার)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮)

    বাস্তবে কাউকে গালি দিলে যে পাপ হয়, কমেন্টে গালি দিলেও সেই পাপ হয়।

  • ষষ্ঠত, ভাইরাল কোনো কন্টেন্ট দেখলে আগে যাচাই করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)

    মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তা-ই বলে বেড়ায়। (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৫)

    যাচাই করা সম্ভব না হলে অপেক্ষা করতে হবে এবং তা শেয়ার করা যাবে না।

আরও পড়ুন
উদ্দেশ্য হলো অন্যায় বন্ধ করা, শুধু প্রচার করা নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তারা যদি ব্যবস্থা না নেয়, তার দায় আমাদের ওপর থাকবে না। কারণ আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।

সবকিছুর প্রতিবাদ কি ফেসবুকে করা উচিত 

যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদের জায়গা ফেসবুক নয়। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার মানে এই নয় যে সব বিষয়ে আমাকে মতামত দিতে হবে। কোনো কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এতে আসলে কাজের কাজ কিছু হয় না, বরং বাস্তব জীবনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

যেকোনো ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো অন্যায় বা অপরাধ দেখলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোই আমাদের যথাযথ দায়িত্ব। কারও অন্যায় সম্পর্কে জানলে তাকে সরাসরি সতর্ক করা যায়, কিংবা যাদের জানালে কাজ হবে তাদের জানানো যায়।

কিন্তু নিজের ওয়ালে তার বিরুদ্ধে পোস্ট দিলে লাভের সম্ভাবনা নেই। বরং এতে তার দোষ প্রচার করা হয়, যা অনুচিত।

হাদিসে অন্যায় দেখলে তা হাত দিয়ে, না পারলে মুখ দিয়ে বদলানোর কথা বলা হয়েছে, আর তা-ও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)

অর্থাৎ উদ্দেশ্য হলো অন্যায় বন্ধ করা, শুধু প্রচার করা নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তারা যদি ব্যবস্থা না নেয়, তার দায় আমাদের ওপর থাকবে না। কারণ আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান ও অনলাইন কেনাকাটার মতো কল্যাণকর কাজের জন্য। সেটা যেন পাপ বা অপরাধের মাধ্যম না হয়ে ওঠে।

মুমিনের প্রতিটি কাজ কল্যাণকর হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। কারণ কান, চোখ ও অন্তর, এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)

  • নাজমুস সাকিব: আলেম ও এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন