হজরত খাদিজা (রা.)-এর বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামের ইতিহাসে নবীজি (সা.) ও খাদিজা (রা.)–এর দাম্পত্য সম্পর্ক কেবল একটি বিয়ে নয়; বরং এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনুপম আদর্শ।

ভালোবাসা, আস্থা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও পারস্পরিক সম্মানের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খুব কম সম্পর্কেই পাওয়া যায়। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেমন নবীজির মহান চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি খাদিজা (রা.)–এর ব্যক্তিত্বও ইতিহাসে স্থায়ী মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে।

বিয়ের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট

হজরত খাদিজা ছিলেন মক্কার এক সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য নারী। তাঁর ব্যবসা ছিল বিস্তৃত এবং সুনামসম্পন্ন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি এমন একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধি খুঁজছিলেন, যিনি হবেন আমানতদার, দক্ষ এবং নৈতিক চরিত্রে অনন্য।

এই প্রেক্ষাপটেই তরুণ মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন থেকেই খাদিজা (রা.) গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে থাকেন মুহাম্মদ (সা.) এর আচার-আচরণ, লেনদেনে সততা, কর্মচারীদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার, নির্লোভ মনোভাব ও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা।

ধীরে ধীরে তাঁর অন্তরে জন্ম নেয় এক গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা। তিনি উপলব্ধি করেন—এই যুবক শুধু দক্ষ ব্যবসায়ী নন; তিনি এক বিরল মানবিক গুণের আধার। তবে উচ্চ বংশীয় ও মর্যাদাসম্পন্ন নারী হওয়ায় তিনি সরাসরি নিজের আগ্রহ প্রকাশ করেননি। বরং সংযম ও শালীনতার সঙ্গে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনিয়া (রা.) এর মাধ্যমে বিষয়টি ইঙ্গিতে উত্থাপন করেন।

আরও পড়ুন

খাদিজা (রা.) নাফিসাকে স্পষ্টভাবে কেবল এটুকুই বলেন, মুহাম্মদ (সা.) একজন অসামান্য চরিত্রের অধিকারী মানুষ। তিনি সরাসরি কোনো আবেগের কথা প্রকাশ করেননি। কিন্তু নাফিসা (রা.) নবীজির চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন।

তাই খাদিজার প্রশংসা শুনেই তিনি নিজ উদ্যোগে মন্তব্য করেন, মুহাম্মদ (সা.) খাদিজার জন্য হতে পারেন এক আদর্শ স্বামী। এটি ছিল নাফিসার নিজস্ব উপলব্ধি। এরপর তিনি এই বিষয়ে মধ্যস্থতা করার অনুমতি চাইলে খাদিজা (রা.) সম্মতি প্রদান করেন।

নাফিসার মধ্যস্থতা ও প্রস্তাব

তিনি এরপর মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যক্তিগত আলাপ শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রশ্ন করেন, আপনি এখনো বিবাহ করছেন না কেন? তখন নবীজির বয়স ছিল ২৫ বছর। অথচ সে যুগের সমাজব্যবস্থায় এই বয়সেই অনেকেই একাধিক বিবাহে আবদ্ধ হয়ে যেত।

মুহাম্মদ (সা.) উত্তর দেন, বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। তখন নাফিসা (রা.) কৌশলে প্রশ্ন করেন, যদি এমন কোনো সম্ভ্রান্ত, ধনাঢ্য ও গুণবতী নারী কোনো আর্থিক দাবি ছাড়াই আপনাকে বিবাহ করতে চান, তাহলে আপনার মত কী হবে?

নবীজি বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চান, কে সেই নারী? নাফিসা বলেন, খুওয়াইলিদের কন্যা খাদিজা।

এ কথা শুনে নবীজি গভীর বিস্ময় ও বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, তিনি কি সত্যিই আমাকে গ্রহণ করবেন? নাফিসা আশ্বাস দেন এবং খাদিজার কাছে ফিরে গিয়ে এই সুসংবাদ পৌঁছে দেন।

আরও পড়ুন

ঐতিহাসিক বিবাহ

এখান থেকেই সূচনা হয় মানবসভ্যতার এক অবিস্মরণীয় সম্পর্কের। বিবাহের প্রস্তাব পেয়ে নবীজি তাঁর অভিভাবক চাচা আবু তালিবকে বিষয়টি জানান। আবু তালিব নিয়ম অনুযায়ী খাদিজার অভিভাবক আমর ইবনে আসদের কাছে প্রস্তাব পেশ করেন।

উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে বিবাহের দিনক্ষণ ও মোহর নির্ধারিত হয়। মোহর ধার্য হয় বিশটি উট।

বিবাহের যাবতীয় আয়োজন ও খরচ বহন করেন খাদিজা (রা.) নিজেই। তিনি দুই উকিয়া (প্রায় ০৭ গ্রাম)  স্বর্ণ ও রৌপ্য পাঠান, যার দ্বারা পোশাক ও ওলিমার ব্যবস্থা করা হয়।

মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই বিবাহ সম্পন্ন হয়। আবু তালিব যে খুতবা পাঠ করেন, তা জাহেলি যুগের আরবি গদ্যসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সেই খুতবার জবাব দেন খাদিজা (রা.)–এর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল।

এই বিবাহের মাধ্যমে খাদিজা (রা.) হয়ে ওঠেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ‘উম্মুল মুমিনিন’—মুমিনদের মা।

দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক দায়িত্ব

এই বিবাহিত জীবন স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ২৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যায় না যে মুহাম্মদ (সা.) কখনো খাদিজা (রা.) সম্পর্কে একটি নেতিবাচক শব্দ উচ্চারণ করেছেন। বরং এই সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক সম্মান, গভীর ভালোবাসা ও নিঃশর্ত আস্থার বন্ধনে আবদ্ধ।

এই সময়ের মধ্যেই তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় চার কন্যা—জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা (রা.) এবং দুই পুত্র—কাসেম ও আব্দুল্লাহ (তাহের)। এছাড়া এই সংসারেই লালিত-পালিত হন আলি ইবনে আবি তালিব, জায়েদ ইবনে হারিসা, জোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং খাদিজার পূর্ববর্তী স্বামীর সন্তান হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.)।

এত বড় একটি পরিবারের দেখভাল, সন্তানদের লালন-পালন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন—সবকিছুর নেপথ্যে ছিলেন খাদিজা (রা.)। তাঁর প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা এই সংসারকে পরিণত করেছিল আদর্শ মানবিক শিক্ষাকেন্দ্রে।

পরবর্তীকালে এই পরিবারের অনেকেই ইসলামের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হন—যার পেছনে খাদিজা (রা.)–এর নীরব ভূমিকা অপরিসীম।

নবীজি ও হজরত খাদিজার দাম্পত্য জীবন আমাদের শেখায়—সুখী সংসারের মূল ভিত্তি বয়স, অর্থ বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়; বরং চরিত্র, আস্থা, ত্যাগ ও পারস্পরিক সম্মান। এই সম্পর্ক প্রমাণ করে, একজন নারীর প্রজ্ঞা ও সমর্থন কিভাবে একটি মহাকালব্যাপী বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

খাদিজা (রা.) ছিলেন শুধু একজন স্ত্রী নন; তিনি ছিলেন নবিজির প্রথম বিশ্বাসস্থাপনকারী, প্রথম সমর্থক ও সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তাঁর এই অবদান ইসলামের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

[সূত্র : তারিখে দিমাশক : ১৯১-২০১, মোস্তফা চরিত : ২৮৫-২৮৬]

আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন