মহানবী (সা.)-এর শৈশব কেটেছে যে ঘরে

ছবি: ফ্রিপিক

‘সে ও তার ভাই গৃহের পেছনে ভেড়া নিয়ে খেলা করছিল!’ (আল-মাতলিবুল আলিয়া)।

ইবনু আব্বাস বলেন, হালিমা নবীজির সন্ধানে বের হলেন—এমন সময় যখন প্রাণীগুলো দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নেয়। তাঁকে তাঁর বোনের সঙ্গে পাওয়া গেল। হালিমা বললেন, ‘এই তপ্ত রোদে খেলছ?’ বোন বলল, ‘হে আম্মাজান, ভাইয়ের ওপর রোদ কোথায়! একটি মেঘখণ্ডকে আমি তাঁর ওপর ছায়া দিতে দেখছি; যখন সে দাঁড়িয়ে যায় তা থেমে যায়, যখন সে দৌড়ায় তা ছুটে চলে!’ (তাবাকাত ইবনে সা’দ)।

কোথায় সেই গৃহ? কোথায় শৈশবের সেই খেলার মাঠ? সেখানকার লোকেরা কেন ও কীভাবে মক্কায় এসেছিল? মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কতবার সেই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি? কেনই-বা আবার মক্কায় ফিরে আসেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কখনো খুঁজেছেন?

মক্কা থেকে ১৫০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ এবং তায়েফ থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণের একটি গ্রামের গল্প আমাদের সব প্রশ্নের সমাধান দেবে। বর্তমান হুদায়বিয়া মরুভূমিতে অবস্থিত মাইসান জেলায় ‘আশ-শুহাতা উপত্যকা’-এর গ্রামটির নাম ‘আদ-দাহাসিন’। এটাই দীর্ঘ দেড় হাজার বছর ধরে ‘বাওয়াদিউ আজ-জুআইবাত’ আর কখনো ‘কারিআতু হালিমা আস-সাআদিয়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। নবীজি (সা.)-এর দুধমাতা হালিমা (রা.)-এর গোত্র বনু সাদের বসতি ছিল এখানেই।

আবদুল্লাহ ইবনু জাফার (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জন্মের পর বনু সাদ ইবনে বাকর গোত্রের নারীদের সঙ্গে হালিমা বিনতু হারিস মক্কায় আসেন। উদ্দেশ্য ছিল দুধের শিশু খোঁজা।

ওই সময় আরবে অন্তত তিনজন ব্যক্তির নাম ছিল ‘মুহাম্মদ’। তাঁদের প্রত্যেকের পিতাই নিজের সন্তান ‘আখেরি নবী’ হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে যান।

হালিমা বলেন, ‘আমার একটি সাদা গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আমি নারীদের অগ্রভাগে রওনা দিই। সঙ্গে ছিল আমার স্বামী হারিস ইবন আবদিল উজ্‌জা। আমাদের গাধাটি হাঁটুতে চোট পেয়েছিল। আমার সঙ্গে আরেকটি সওয়ারি ছিল উষ্ট্রী। শপথ আল্লাহর! সেটি এক ফোঁটাও দুধ দিত না। বছরটি ছিল দুর্ভিক্ষের। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের অবস্থা ছিল দুর্বিষহ। সঙ্গে ছিল আমার শিশুসন্তান। শপথ আল্লাহর, ক্ষুধার তাড়নায় সে-ও রাতে ঘুমাতে পারত না। আমার কাছে এমন কিছু ছিল না, যা দিয়ে তাকে ভুলিয়ে রাখব। তবে আমাদের কিছু ভেড়া ছিল, তাই আমরা বৃষ্টির প্রত্যাশা করছিলাম।’

বনু সাদের অবস্থান এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁরা মক্কায় আসতে বাধ্য হয়েছেন, তা আমরা জানলাম। এটি জাগতিক উত্তর। তবে আরেকটি বিষয় ভাবুন, ঠিক সেই সময় কেনই-বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে? কেনই-বা আরবে দুধমাতা সংস্কৃতির প্রচলন হয়েছিল? মক্কার সেই শিশুটিকে কেন শহরের কোলাহল ছেড়ে দূর মরুভূমিতে পাঠানো হয়েছিল?

আল্লাহর পরিকল্পনা কত নিখুঁত! তিনি নবীজি (সা.)-কে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ওই সময় আরবে অন্তত তিনজন ব্যক্তির নাম ছিল ‘মুহাম্মদ’। তাঁদের প্রত্যেকের পিতাই নিজের সন্তান ‘আখেরি নবী’ হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে যান। তাঁদের একজন উমাইয়া কবি ফারাযদাক্বের প্রপিতামহ মুহাম্মাদ বিন সুফিয়ান, অন্যজন মুহাম্মাদ ইবনে উহাইহাহ এবং তৃতীয়জন মুহাম্মাদ ইবনে হুমরান।

তাঁদের পিতারা বিভিন্ন সম্রাটের দরবারে জানতে পারেন যে শেষ নবী হেজাজে জন্মগ্রহণ করবেন। ফলে তাঁরা মানত করেছিলেন যে পুত্রসন্তান হলে নাম রাখবেন ‘মুহাম্মদ’। মক্কায় নবীজি (সা.)-এর নাম যখন ‘মুহাম্মদ’ রাখা হয়, তখন সবাই এই নতুন নামে বিস্মিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন

হালিমা সাদিয়া বলেন, ‘মক্কায় আসার পর আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রত্যেককে প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রস্তাবটি কারও মনঃপূত হয়নি। কারণ, তিনি ছিলেন এতিম। ধাত্রীর পারিশ্রমিক তো সন্তানের বাবা দিয়ে থাকেন। এই শিশুর মা কিংবা দাদা আমাদের কী দেবেন? আমার সঙ্গের প্রত্যেক নারীই দুগ্ধশিশু পেয়ে গিয়েছিলেন। আমি কাউকে না পেয়ে তাঁর (নবীজি) কাছে ফিরে আসি এবং তাঁকে নিয়ে নিই। কেবল অন্য কোনো শিশু পাইনি বলেই আমি তাঁকে নিয়েছিলাম। আমার স্বামীকে বললাম, শপথ আল্লাহর! আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশের এই এতিম শিশুকে নেব; হতে পারে, আল্লাহ আমাদের এর বদৌলতে কল্যাণ দান করবেন। একেবারে শূন্য হাতে আমি ফিরব না।’

হালিমা শিশুটিকে নিয়ে মালপত্রের কাছে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা নামতেই আমার দুই স্তন দুধে ভরপুর হয়ে ওঠে। আমি তাঁকে ও তাঁর ভাইকে তৃপ্তিসহকারে দুধ পান করাই। আমার স্বামী উষ্ট্রীর কাছে গিয়ে দেখেন, সেটির ওলানও দুধে ফুলে উঠেছে। দুধ দোহন করে তিনি আমাকে পান করান এবং নিজেও পান করেন। তিনি বলে ওঠেন—হালিমা! জানো, আমরা একটি বরকতময় শিশু পেয়েছি! অবশেষে আমরা একটি রাত ভালোভাবে কাটাই। অথচ এর আগে বাচ্চাকে নিয়ে আমরা রাতে ঘুমাতেই পারতাম না।’

এরপর থেকে প্রতিদিন তাঁদের জীবনে কল্যাণ বাড়তে থাকে। অবশেষে তাঁরা যখন বাড়িতে পৌঁছান, তখনো দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে। মক্কা থেকে বনু সাদের এই দীর্ঘ পথে নবীজি (সা.) সফর করেছিলেন।

পাঠক, একবার ভেবে দেখুন বনু সাদ থেকে মক্কায় আসা সেই পরিবারটির কথা। স্বামী, স্ত্রী, একটি শিশু, একটি গাধা ও একটি উষ্ট্রী। মক্কায় একটি রাত কাটানোর পর কী বর্ণনাতীত অভাব থেকে আল্লাহ তাঁদের অবস্থা সচ্ছলতায় বদলে দিলেন। বাড়ি পৌঁছাতে হয়তো দু-এক দিন সময় লেগেছিল।

কিন্তু পথের সেই বিস্ময়কর বর্ণনা শুনুন হালিমা (রা.)-এর জবানিতে:

‘দুপুরের আহার শেষে সঙ্গীদের সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিই। শিশুটিকে নিয়ে আমি আমার সেই সাদা গাধাটিতে আরোহণ করি। শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে হালিমার প্রাণ! আমার সওয়ারি পুরো কাফেলাকে পেছনে ফেলে দেয়। পরিশেষে অন্য নারীরা বলতে বাধ্য হয়, “আমাদের জন্য একটু থামো! এটি কি সেই গাধা নয়, যা নিয়ে তুমি বাড়ি থেকে বের হয়েছিলে?”

আমি বললাম, হ্যাঁ। তারা অবাক হয়ে বলল, তখন তো এটি সবার পেছনে থাকত, এখন এর কী হলো? আমি বললাম, শপথ আল্লাহর! এর ওপর আমি এক বরকতময় শিশুকে নিয়েছি।’

এরপর থেকে প্রতিদিন তাঁদের জীবনে কল্যাণ বাড়তে থাকে। অবশেষে তাঁরা যখন বাড়িতে পৌঁছান, তখনো দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে। মক্কা থেকে বনু সাদের এই দীর্ঘ পথে নবীজি (সা.) সফর করেছিলেন। এরপর আরও অন্তত তিনবার এই পথ তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল। এখনো অনেকে নবীজির স্মৃতিবিজড়িত সেই স্থান দেখতে যান। সেই চারণভূমি আজও পথিকের চোখ শীতল করে।

হালিমা (রা.) বলেন, ‘আমাদের পশুর পাল চারণভূমিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করত। বনু সাদের অন্য সব ভেড়া সন্ধ্যায় অভুক্ত অবস্থায় ফিরত; অথচ আমার ভেড়াগুলো ফিরত হৃষ্টপুষ্ট হয়ে, ওলানগুলো দুধে ভরা থাকত। অন্যেরা তাদের রাখালদের বলতে লাগল—হারিস ও হালিমার ভেড়াগুলো যে চারণভূমিতে চরে, তোমাদেরগুলোও সেখানে চরাও। কিন্তু ফলাফল আগের মতোই হতো।’

আরও পড়ুন

শিশু মুহাম্মদ (সা.) অন্য শিশুদের চেয়ে দ্রুত বেড়ে উঠছিলেন। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর হালিমা ও তাঁর স্বামী তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। হালিমা বলেন, ‘আমরা তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে পীড়াপীড়ি করলাম যেন শিশুটিকে আরও কিছুদিন আমাদের কাছে রাখা হয়। কারণ, তাঁর বরকতে আমাদের জীবনে অনেক কল্যাণ এসেছে। অবশেষে মা আমিনা রাজি হলেন। আমরা তাঁকে নিয়ে ফিরে এলাম।’

নবীজি (সা.) প্রায় আড়াই বছর হালিমার গৃহে ছিলেন। মরুভূমির সেই ছোট্ট গৃহটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ইতিহাসের চিহ্ন বয়ে চলছিল। তবে দুঃখের বিষয়, অতি-রক্ষণশীল ব্যাখ্যার কারণে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হালিমার সেই গৃহ, পাশের মসজিদ ও গাছপালা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

হালিমার বর্ণনার পরের অংশটি ছিল নবীজিকে মক্কায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপট। বক্ষ বিদীর্ণ করার সেই ঘটনার কথা জানিয়ে হালিমা বলেন, ‘মুহাম্মদের দুধভাই দৌড়ে এসে বলল—আমার কোরাইশি ভাইয়ের কাছে সাদা কাপড় পরা দুজন লোক এসেছে। তারা তাঁকে শুইয়ে দিয়ে তাঁর পেট কেটে ফেলেছে! আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তবে তাঁর গায়ের রং নীল হয়ে গেছে। আমাদের দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, বাবা, তোমার কী হয়েছে?’ (আল-মাতালিবুল আলিয়া)

গল্পের এই পর্যায়ে দুটি প্রশ্ন মনে আসে।

প্রথমত, নবীজির জীবনে কি বনু সাদের দিনগুলোর কোনো প্রভাব ছিল? আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি বলেছেন, ‘আমি আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী; কোরাইশ আমাকে জন্ম দিয়েছে আর আমি বেড়ে উঠেছি বনু সাদে।’ (মুজাম আল-কাবির, ৫৪৩৭)

মরুভূমির সেই ছোট্ট গৃহটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ইতিহাসের চিহ্ন বয়ে চলছিল। তবে দুঃখের বিষয়, অতি-রক্ষণশীল ব্যাখ্যার কারণে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হালিমার সেই গৃহ, পাশের মসজিদ ও গাছপালা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, পরবর্তী সময়ে এই পরিবারের সঙ্গে নবীজির সম্পর্ক কেমন ছিল? ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, হালিমা (রা.) মক্কায় নবীজির কাছে এসেছিলেন যখন তিনি খাদিজাকে বিয়ে করেছেন। হালিমা নিজেদের অভাবের কথা বললে খাদিজা (রা.) তাঁকে ৪০টি বকরি ও একটি উট দান করেন।

ওমর ইবনে আস-সায়িব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বসা অবস্থায় তাঁর দুধপিতা এলে তিনি নিজের চাদরের একাংশ বিছিয়ে দেন। এরপর দুধমাতা ও দুধভাই এলেও তিনি তাঁদের প্রতি একই রকম সম্মান প্রদর্শন করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৪৩)

ইতিহাস বলছে, হালিমা মক্কায় এলে নবীজি ‘আম্মাজান! আম্মাজান!’ বলে আনন্দ প্রকাশ করতেন। হোনাইনের যুদ্ধের পর যখন হাওয়াজিন গোত্রের বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়, তখন নবীজির বদান্যতায় ছয় হাজার যুদ্ধবন্দী মুক্তি পায়। তাঁদের মধ্যে নবীজির দুধবোন শায়মা বিনতে হারিসও ছিলেন।

শায়মা যখন নিজের পরিচয় দিলেন, নবীজি আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিলেন। শায়মা ইসলাম কবুল করেন এবং নবীজি তাঁকে উপহারস্বরূপ দাস-দাসী ও গবাদিপশু দান করেন।

আল্লাহ–তাআলা হালিমা (রা.)-এর পরিবারকে দুনিয়াতে প্রভূত কল্যাণ দিয়েছেন। পরকালেও তাঁদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।

  • ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক: অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন