শৈশবে আমরা প্রায় সবাই একটি নীতিবাক্য পড়েছি, ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ, মেকস আ ম্যান হেলদি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ।’ শৈশবের সেই ছন্দ আজও অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে; কিন্তু পরিণত বয়সে এসেও এর মর্মার্থ দৈনন্দিন জীবনে খুব কম মানুষই বাস্তবায়ন করতে পারে।
গবেষকেরা একবাক্যে স্বীকার করেন, সুস্থ, দীর্ঘায়ু ও কর্মক্ষম জীবনের মূল ভিত্তি হলো রাতে দ্রুত বিছানায় যাওয়া এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। অপ্রয়োজনে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাস শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।
একই পরামর্শ বিশ্বমানবতার সামনে সুন্নত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন প্রিয় নবী (সা.)। তিনি এশার নামাজের পূর্বে ঘুমানো অপছন্দ করতেন এবং এশার নামাজের পর অহেতুক কথাবার্তা বা গল্পগুজব করাকে অপছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)
এশার আগে ঘুম কেন
নবীজির এই নির্দেশনার পেছনে গভীর প্রজ্ঞা ও মানবকল্যাণ নিহিত রয়েছে:
এশার পূর্বে ঘুম: মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে ঘুমিয়ে পড়লে ক্লান্তির কারণে এশার নামাজ কাজা হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
এশার পর গল্পগুজব: এশার পর অহেতুক আড্ডা ও আলাপে মেতে থাকলে রাতের এক বড় অংশ বৃথা নষ্ট হয় এবং ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়। ফলে ফজরের জামাত ছুটে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং শেষ রাতের বরকতময় তাহাজ্জুদ ও দোয়া থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়।
রাতের প্রথম প্রহরে দ্রুত ঘুমালে শারীরিক ক্লান্তি দূর হয় এবং শেষ রাতে রবের সামনে দাঁড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়।
দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাতে এশার পর মানুষকে গল্প করতে দেখলে কঠোরভাবে বারণ করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা কি রাতের প্রথম ভাগে গল্পগুজব করবে, আর শেষ ভাগে (তাহাজ্জুদ ও ফজরের সময়) ঘুমে অচেতন হয়ে থাকবে?’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ২/৭৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত)
অনর্থক সময় কাটানো
বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এশার পরের সময়টি অনেকের কাছে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা বা চ্যাটিংয়ের মূল সময়ে রূপ নিয়েছে। অথচ এশার পর অনর্থক কর্মকাণ্ডে সময় নষ্ট করা ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, দ্বীনি ইলম চর্চা, পরিবারের প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ছাড়া এশার পর সাধারণ দুনিয়াবি গল্পগুজব করা অনুচিত। আর যে কথায় কোনো পার্থিব বা পরকালীন কল্যাণ নেই, তা থেকে সব সময় বিরত থাকাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তির উত্তম মুসলিম হওয়ার অন্যতম সৌন্দর্য হলো—সে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও কাজ সম্পূর্ণ বর্জন করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
এশার পর দ্রুত ঘুমানো কেবল শরীর সুস্থ রাখার উপায় নয়; এটি একটি বরকতময় সুন্নাহ। এ অভ্যাসের ফলে ভোরে সতেজ মনে দিনের কাজ শুরু করা যায় এবং শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের পথ সুগম হয়।
আহমাদ সাব্বির : লেখক ও গবেষক