মুসলিম সমাজে মোনাফেক কারা, তারা কীভাবে কাজ করে

ছবি: পেক্সেলস

আরব মরুভূমির এক ছোট্ট ও চঞ্চল প্রাণী ‘জারবোয়া’। খুব বেশি লাফায় বলে একে অনেকে মরু ইঁদুর বা ক্যাঙ্গারি ইঁদুর বলে। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এই প্রাণীটির এক অদ্ভুত প্রবৃত্তি হয়, যা প্রাচীনকাল থেকেই আরবদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।

জারবোয়া যখন মাটির নিচে নিজের থাকার জন্য গর্ত তৈরি করে, তখন সে বিপদের সময় পালানোর জন্য একটি বিকল্প পথও খুঁড়ে রাখে। এই গোপন পথের মুখে সে মাটির খুব পাতলা একটি আস্তরণ দিয়ে রাখে, যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায়। বিপদের আঁচ পেলে সে মাথা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সেই পাতলা মাটির স্তর ভেঙে দ্রুত পালিয়ে যায়।

আরবরা জারবোয়ার গর্তের এই প্রথম ও মূল পথকে বলত ‘কাসিয়া’ এবং দ্বিতীয় গোপন পথকে বলত ‘নাফিকা’। এই ‘নাফিকা’ শব্দ থেকেই ‘নিফাক’ বা মোনাফেকির ধারণাটি এসেছে। কারণ মোনাফেকদের চরিত্রও ঠিক এই প্রাণীর মতোই; তাদের বাইরে থাকে এক রূপ, আর ভেতরে থাকে গোপন গর্ত, যার মাধ্যমে তারা সুযোগ পেলে প্রতারণার আশ্রয় নেয়।

মক্কায় ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিমদের অবস্থা যখন দুর্বল ছিল, তখন অবিশ্বাসীরা সরাসরি শত্রুতা প্রকাশ করত। কিন্তু মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা যখন হিজরত করে মদিনায় গেলেন, তখন সমাজচিত্র বদলে গেল। সেখানে এমন একদল মানুষের উদ্ভব হলো, যারা মুখে ইসলামের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে অবিশ্বাস, অহংকার ও শত্রুতা লালন করত।

মদিনার নতুন পরিবেশে মুসলিমদের ক্ষমতা ও প্রভাব বাড়তে থাকায় তারা সরাসরি বিরোধিতা করার সাহস পায়নি। তাই তারা এমন এক ভয়াবহ আদর্শিক ও আচরণগত বিকৃতির পথ বেছে নিল, যার সঙ্গে মুসলিমরা আগে পরিচিত ছিল না।

তোমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদগ্রস্ত করেছ। তোমরা (মুমিনদের অমঙ্গলের) অপেক্ষায় ছিলে, তোমরা সন্দেহ পোষণ করেছিলে এবং মিথ্যা আশা তোমাদের প্রতারিত করেছিল; যতক্ষণ না আল্লাহর নির্দেশ এসে পৌঁছাল। আর প্রতারক (শয়তান) তোমাদের আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছিল।
সুরা হাদিদ, আয়াত: ১৪

মোনাফেকের মানসিক টানাপোড়েন

মোনাফেকরা সবসময়ই এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে। বাইরে তারা নিজেদের মুসলিম সমাজের অংশ হিসেবে জাহির করে, কিন্তু ভেতরে তারা সেই সমাজের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি প্রবল নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। এই স্ববিরোধিতার কারণে তাদের ভেতরটা সবসময় অশান্ত থাকে এবং তারা তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে।

এই মানসিক অবস্থা একটি ‘ব্যাধি’। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০)

এই ব্যাধি একপর্যায়ে ক্যান্সারের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তারা নিজেদের এই ব্যাধি অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত করতে চায়, যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে এবং সমাজের সাধারণ শান্তি বিঘ্নিত করে।

পরকালেও যখন মুমিন ও মোনাফেকদের মধ্যে কথোপকথন হবে, তখন মোনাফেকরা মুমিনদের আলো থেকে একটু সুবিধা নিতে চাইবে। তারা দাবি করবে যে পৃথিবীতে তো তারা মুমিনদের কাতারেই ছিল। তারা ধূর্ততার সঙ্গে মুমিনদের জিজ্ঞেস করবে, “আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?”

আরও পড়ুন

এর জবাবে তাদের কপটতার চারটি দিক উন্মোচন করে বলা হবে, “হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদগ্রস্ত করেছ। তোমরা (মুমিনদের অমঙ্গলের) অপেক্ষায় ছিলে, তোমরা সন্দেহ পোষণ করেছিলে এবং মিথ্যা আশা তোমাদের প্রতারিত করেছিল; যতক্ষণ না আল্লাহর নির্দেশ এসে পৌঁছাল। আর প্রতারক (শয়তান) তোমাদের আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছিল।” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ১৪)

মোনাফেকের ৪ বৈশিষ্ট্য

উপরে জবাবের মাঝেই মোনাফেকদের প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।

১. ভেতরে এক, বাইরে অন্য: তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা বিশ্বাস করে না এবং কাজেও তা প্রমাণ করে না। তারা এমন সব নৈতিক আদর্শের বুলি আওড়ায়, যা নিজেরা কখনোই পালন করে না। আবার তারা এমন সব কাজের সমালোচনা করে, যা তারা নিজেরাই গোপনে করে বেড়ায়।

এই ধরনের মানুষেরা নিজেদের নৈতিকতার একটি ‘ভুল সংকেত’ সমাজের সামনে উপস্থাপন করে। এর ফলে সমাজ যখন তাদের আসল রূপটি ধরে ফেলে, তখন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, “মোনাফেকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তার খেয়ানত করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)

যখন মানুষের ভেতরের সত্তা এবং বাইরের প্রদর্শিত রূপের মাঝে এই মাত্রার বিরোধ তৈরি হয়, তখন তা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। মুমিনদের সাফল্য দেখলে এরা ভেতরে ভেতরে তীব্র ক্ষোভে জ্বলতে থাকে।

২. নেতিবাচক তৎপরতা: তারা দ্বিমুখী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং নৈতিক অবক্ষয় তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারা অবলীলায় বড় বড় অপরাধ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মিথ্যা শপথ করে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করে।

এরা মূলত সমাজের ভেতর গুপ্তঘাতক হিসেবে কাজ করে। মক্কার অবিশ্বাসীরা ছিল সরাসরি শত্রু, যাদের মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ ছিল, কারণ তাদের অবস্থান ছিল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু মদিনার মোনাফেকরা ছিল ঘাপটি মেরে থাকা শত্রু।

নবীজির ইন্তেকালের পর, ওহির আগমন বন্ধ হয়ে গেলে মোনাফেকদের এই চরিত্র আরও খোলামেলা রূপ নেয়।

সাহাবি হুজাইফা (রা.) সেই সময়ের সমাজচিত্র দেখে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “নবীজির যুগে যারা মোনাফেক ছিল, আজকের দিনের মোনাফেকরা তাদের চেয়েও জঘন্য। কারণ, তারা তাদের কপটতা গোপন রাখত, আর এরা প্রকাশ্যে তা করে বেড়ায়।” (ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৭/২৫৪, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৪)

৩. সত্যের প্রতি সংশয়: তারা না পারে পুরোপুরি সত্য গ্রহণ করতে, না পারে পুরোপুরি তা বর্জন করতে। কোরআনের ভাষায়, “তারা এর মাঝখানে দোদুল্যমান; না এদের দিকে, না ওদের দিকে।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৩)

তাদের এই দিশেহারা অবস্থাটি বোঝাতে গিয়ে একটি চমৎকার উপমা দেওয়া হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, “মোনাফেকের উদাহরণ হলো দুই পালের মাঝে ঘুরে বেড়ানো একটি ভেড়ার মতো। সে একবার এই পালের দিকে যায়, আবার ওই পালের দিকে যায়; সে বুঝতে পারে না কোনটির অনুসরণ করবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৮৪)

আরও পড়ুন

যখন মানুষের ভেতরের সত্তা এবং বাইরের প্রদর্শিত রূপের মাঝে এই মাত্রার বিরোধ তৈরি হয়, তখন তা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। মুমিনদের সাফল্য দেখলে এরা ভেতরে ভেতরে তীব্র ক্ষোভে জ্বলতে থাকে।

কোরআনে তাদের এই অবস্থার চিত্রায়ন করা হয়েছে এভাবে, “আর যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে তারা নিজেদের আঙুলের অগ্রভাগ কামড়ায়। বলে দাও, তোমাদের আক্রোশেই তোমরা মরো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৯)

আবার যখন কোনো কঠিন মুহূর্ত বা ত্যাগ স্বীকারের সময় আসে, তখন তারা মৃত্যুভয়ে গুটিয়ে যায়। যেমন বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন কোনো সুনির্দিষ্ট সুরা অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের কথা উল্লেখ থাকে, তখন যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তুমি তাদের দেখবে, মৃত্যুভয়ে মূর্ছিত ব্যক্তির মতো তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২০)

৪. পার্থিব মোহ ও মরীচিকা: মোনাফেকি শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। মানুষের বেপরোয়া আকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপত্তা ও স্বীকৃতির আদিম প্রবৃত্তিগুলো যখন পথভ্রষ্ট হয়, তখনই কপটতার জন্ম হয়। মোনাফেকরা সবসময় শুধু নগদ লাভ ও স্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায়। কোনো কাজ থেকে পার্থিব সুবিধা বা ক্ষমতা না পেলে তারা সেখানে পা মাড়ায় না।

মোনাফেকি হলো এমন এক বিষাক্ত গাছ, যা মিথ্যা ও লোকদেখানো স্বভাব—এই দুটি নালার পানিতে বেড়ে ওঠে। আর এই নালা দুটির উৎস হলো অন্তর্দৃষ্টির দুর্বলতা ও সংকল্পের অভাব। এই চারটির সমন্বয়ে মোনাফেকির গাছ শক্তভাবে শিকড় গাড়ে।”
ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যা (রহ.)

শেষ কথা

বিশেষজ্ঞরা কপটতাকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করে থাকেন।

প্রথমত, ‘অবচেতন কপটতা’—যেখানে মানুষ না বুঝেই নিজের নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, ‘পরিস্থিতিগত কপটতা’—পরিবেশ বা কর্মক্ষেত্রের চাপে পড়ে নীতির সঙ্গে আপস করা।

এবং তৃতীয়ত, ‘চতুরতামূলক কপটতা’—যেখানে ব্যক্তি নিজের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য সম্পূর্ণ সচেতনভাবে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এই চতুরতামূলক কপটতাই সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

আধুনিক জীবনব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে এই কপটতা এক নতুন রূপ পেয়েছে। মানুষ এখন নিজেদের জীবনের একটি মিথ্যা ছবি অন্যের সামনে তুলে ধরতে পাগলপ্রায়।

ফলে সমাজে সাফল্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রতিযোগিতার মতো ইতিবাচক ধারণাগুলো মূল অর্থ হারিয়ে ফেলছে এবং মানুষ তার সহজাত মানবিক গুণাবলি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

এই ব্যাধির শেকড় কতটা গভীর, তা বোঝাতে গিয়ে ইবনুল কাইয়িম (রহ.) একটি চমৎকার তুলনা টেনেছেন।

তিনি বলেন, “মোনাফেকি হলো এমন এক বিষাক্ত গাছ, যা মিথ্যা ও লোকদেখানো স্বভাব—এই দুটি নালার পানিতে বেড়ে ওঠে। আর এই নালা দুটির উৎস হলো অন্তর্দৃষ্টির দুর্বলতা ও সংকল্পের অভাব। এই চারটির সমন্বয়ে মোনাফেকির গাছ শক্তভাবে শিকড় গাড়ে।” (ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকিন, ১/৩৫৫, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)

আরও পড়ুন