পরিবারের ভাঙন রোধ মুমিনের ১০ কর্তব্য

প্রতিটি সম্পর্কই যত্ন দাবি করেছবি: পেক্সেলস

পবিত্র কোরআনে দাম্পত্য সম্পর্ককে বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

আধুনিক জীবনের জটিলতায় অনেক সময় এই প্রশান্তি ও দয়া হারিয়ে যায়। দেখা দেয় তিক্ততা, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় বিবাহবিচ্ছেদ।

অভিজ্ঞ ম্যারেজ কাউন্সেলর ও থেরাপিস্টদের মতে, দাম্পত্য জীবনে ভাঙন কেবল বড় কোনো অনৈতিক কাজের কারণেই ঘটে না, বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কিছু আচরণ ও ভুল–বোঝাবুঝি ধীরে ধীরে বিচ্ছেদের পথ প্রশস্ত করে।

একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দাম্পত্য জীবন সফল করতে হলে এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে তার সমাধান করা জরুরি।

১. সঙ্গীকে বদলে দেওয়ার প্রবণতা

দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো সঙ্গীকে নিজের ছাঁচে গড়ে তোলার চেষ্টা করা। অনেক সময় আমরা সঙ্গীর সেই গুণগুলোকেই অপছন্দ করতে শুরু করি, যা বিয়ের শুরুতে হয়তো আমাদের আকর্ষণ করেছিল।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আপনি আপনার সঙ্গীকে জোর করে বদলাতে পারবেন না; আপনি কেবল নিজেকে এবং আপনার প্রতিক্রিয়াকে বদলাতে পারেন। ইবনুল জাওজি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সঙ্গীর ত্রুটিগুলো ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং নিজের সংশোধন করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। (সাইদুল খাতির, ১/৯২, দারুল কলম, বৈরুত, ২০০৪)

যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪,৮১১
আরও পড়ুন

২. যোগাযোগের পার্থক্য

অনেক দম্পতি মনে করেন, তাঁরা সারা দিন কথা বলছেন মানেই তাঁদের মধ্যে চমৎকার যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আদতে কেবল অভিযোগ করা, সমালোচনা করা বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা প্রকৃত যোগাযোগ নয়। কার্যকর যোগাযোগের অর্থ হলো সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করা।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,০১৮)

দাম্পত্য জীবনে এই ‘ভালো কথা’ এবং সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধই হলো সার্থক যোগাযোগের মূল চাবিকাঠি।

৩. সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা

আমরা অফিস, বন্ধুবান্ধব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর সময় দিলেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে সময় দিতে ভুলে যাই। দিনে অন্তত পাঁচ মিনিট হলেও একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা বা গুণগত সময় (কোয়ালিটি টাইম) কাটানো দাম্পত্যের ভিত মজবুত করে।

পরিবারকে সময় দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১,১৬২)

অনেক দম্পতি একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস করলেও একে অপরের থেকে মানসিকভাবে অনেক দূরে থাকেন। যখন একে অপরের প্রতি আকর্ষণ বা আগ্রহ হারিয়ে যায়, তখনই দাম্পত্যের উজ্জ্বলতা ম্লান হতে শুরু করে।

৪. অন্তরঙ্গতার অভাব

অন্তরঙ্গতা বলতে কেবল শারীরিক সম্পর্ককে বোঝায় না; এটি মানসিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগীয় সংযোগ। অনেক দম্পতি একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস করলেও একে অপরের থেকে মানসিকভাবে অনেক দূরে থাকেন। যখন একে অপরের প্রতি আকর্ষণ বা আগ্রহ হারিয়ে যায়, তখনই দাম্পত্যের উজ্জ্বলতা ম্লান হতে শুরু করে।

মুহাম্মদ আল-গাজালি লিখেছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা কেবল জৈবিক নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আত্মিক বন্ধন, যা নিয়মিত পরিচর্যার দাবি রাখে। (খুলুকুল মুসলিম, ১/১৮৪, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৪)

৫. মনোযোগের বিচ্যুতি

সন্তান জন্ম নেওয়ার পর অনেক সময় মায়েদের সবটুকু মনোযোগ কেবল সন্তানের দিকে চলে যায়। ফলে স্বামী নিজেকে অবহেলিত মনে করতে শুরু করেন।

অন্যদিকে প্রযুক্তির আসক্তি বর্তমান সময়ের এক নীরব ঘাতক। রাতের বেলা বিছানায় শুয়েও যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনে দুটি আলাদা স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন তাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। এই মনোযোগের অভাব ধীরে ধীরে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন
কার্যকর যোগাযোগের অর্থ হলো সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করা
ছবি: পেক্সেলস

৬. আর্থিক টানাপোড়েন ও নিয়ন্ত্রণ

স্বামী যদি সম্পদকে স্ত্রীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে সেখানে তিক্ততা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আবার কর্মজীবী দম্পতিদের ক্ষেত্রে কার আয় বেশি বা কার অধিকার কতটুকু—এ নিয়ে অহংবোধ বা প্রতিযোগিতা শুরু হলে সম্পর্ক নষ্ট হয়।

ইসলামে স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব দিলেও নারীর উপার্জনকে তার নিজস্ব অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ৩২)

৭. ক্ষমাশীলতার অভাব

তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা বা সঙ্গীর পুরোনো ভুলগুলো বারবার টেনে আনা সম্পর্কের জন্য বিষস্বরূপ। ঘর গোছানো বা ছোটখাটো ভুলের জন্য যেমন ক্ষমা প্রয়োজন, তেমনি বড় কোনো ভুলের ক্ষেত্রেও শর্তহীন ক্ষমার মানসিকতা থাকতে হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, তবে তা-ই তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৭)

ক্ষমার অভাব থাকলে সম্পর্কে কেবল অভিযোগ ও তিক্ততাই অবশিষ্ট থাকে।

৮. কৃতজ্ঞতার অভাব ও অবমূল্যায়ন

অনেক স্বামী বা স্ত্রী মনে করেন যে সঙ্গী যা করছেন, তা তো তাঁর দায়িত্বই, এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে? অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪,৮১১)

সঙ্গীর ছোট ছোট কাজের প্রশংসা ও তাঁকে মূল্যায়ন করা দাম্পত্যের বড় বিনিয়োগ।

১০টি কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইমানি মূল্যবোধের অভাব। প্রতিটি সম্পর্কই যত্ন দাবি করে।

৯. ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের জের

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নিজের সঙ্গীর সঙ্গে শেয়ার করার মতো আবেগগুলো অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করাও একধরনের বিশ্বাসভঙ্গ। ইসলামে এ ধরনের মেলামেশার পথ শুরুতেই বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পবিত্র বন্ধনটি কলুষিত না হয়। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩২)

১০. ক্ষমতার লড়াই বা আধিপত্য বিস্তার

অনেক দম্পতি এমনকি ধর্মীয় বিষয়েও একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন—কে বেশি জানে বা কার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে তা নিয়ে। যখন ভালোবাসা ও দয়ার চেয়ে জেদ ও নিজেকে ঠিক প্রমাণ করার ইচ্ছা বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই বিজয় হয় অন্তঃসারশূন্য।

দাম্পত্য জীবনে একের ওপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেয়ে ত্যাগের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা উত্তম।

বিবাহবিচ্ছেদ কেবল দুটি মানুষের আলাদা হওয়া নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গ। ওপরের ১০টি কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইমানি মূল্যবোধের অভাব। প্রতিটি সম্পর্কই যত্ন দাবি করে।

আমরা যদি আমাদের সঙ্গীকে আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত হিসেবে গণ্য করি এবং তাঁর ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমার চোখে দেখি, তবেই আমরা একটি আনন্দময় সংসার গড়ে তুলতে পারব। আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন