একবার নবীজির কাছে এক সাহাবি এলেন নামাজের ওয়াক্ত জানতে। সাহাবিকে নবীজি মৌখিক উত্তর দিলেন না। যেতেও দিলেন না সেদিন। নিজের কাছে রেখে দিলেন দুই দিন।
এই দুই দিন ধরে চলবে তাঁর হাতে–কলমে পাঠদান। নবীজি (সা.) বললেন, ‘দুই দিন আমাদের সঙ্গে নামাজ পড়ো, তবেই সব বুঝে যাবে।’
নবীজির এই নির্দেশ দ্বারা বোঝা যায়, সাহাবির বাড়ি ছিল মদিনার বাইরে। নয়তো তাঁর এমনিতেই নবীজির মসজিদে নামাজ পড়ার কথা।
প্রথম দিন দুপুরে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে তিনি বেলালকে জোহরের আজান দিতে বললেন। বেলাল আজান দিলেন। তাঁর ইকামতে নামাজ হলো জোহরের। এরপর নবীজি আবার আজান দিতে বললেন বেলালকে।
সূর্য তখনো বেশ ওপরে এবং সূর্যের শরীর ঝলমল করছে আলোয়। বেলাল (রা.) আজান দিলেন। এই আজান আসরের। সাহাবিরা বেলালের আজান ইকামতে আসরের নামাজ পড়লেন নবীজির পেছনে।
ইশার নামাজ শেষে রাতের অন্ধকার ছেয়ে ফেলল মদিনাকে। মুসলিম জনপদ ঘুমিয়ে পড়ল। প্রশ্নকর্তা সাহাবিও ঘুমালেন মসজিদের আশপাশে কারও বাড়িতে।
সূর্য যখন ডুবে গেল, নবীজি (সা.) মাগরিবের আজানের আদেশ দিলেন। তারপর সবাইকে নিয়ে তিনি মাগরিবের নামাজ পড়লেন। খানিক পর আকাশ থেকে যখন সূর্যাস্তের লাল আভা দূর হয়ে গেল, নবীজি এবার আদেশ করলেন ইশার আজান দিতে। বেলাল আজান দিলেন। সেই সাহাবিসহ সবাই ইশার নামাজ পড়লেন।
ইশার নামাজ শেষে রাতের অন্ধকার ছেয়ে ফেলল মদিনাকে। মুসলিম জনপদ ঘুমিয়ে পড়ল। প্রশ্নকর্তা সাহাবিও ঘুমালেন মসজিদের আশপাশে কারও বাড়িতে।
আরামদায়ক নিদ্রা শেষে এরপর যখন সুবহে সাদিক হলো, নবীজি (সা.) আদেশ করলেন ফজরের আজান দিতে। বেলাল আজান দিলেন। চরাচরে অন্ধকার থাকতেই নবীজি ফজরের নামাজ পড়লেন।
এভাবেই অতিবাহিত হলো প্রথম দিন।
দ্বিতীয় দিনে নবীজি (সা.) জোহরের নামাজ পড়লেন বেশ দেরিতে, রোদের তাপ ও তীব্রতা আরামদায়ক হওয়ার পর। আসরের নামাজও পড়লেন আগের দিনের তুলনায় দেরিতে, সূর্যের গায়ে কমলা রং ধরার কিছুটা আগে।
আর মাগরিব পড়লেন রক্তিম আভা ডুবে যাওয়ার খানিক আগে। ইশা পড়লেন রাতের এক–তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর। আর ফজর পড়লেন তখন, যখন পূর্ব দিগন্ত পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
শিক্ষাদানে তিনি এমন এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন, শিক্ষার্থী যত দুর্বল মেধার অধিকারী হোক, ভুলে যাওয়ার তাঁর কোনো উপায়ই নেই।
এরপর তিনি উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, নামাজের ওয়াক্ত জানতে চাওয়া সেই প্রশ্নকর্তা কোথায়?
সাহাবি এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এই তো আমি।’
নবীজি (সা.) বললেন, গত দুই দিন যে দুই সময়ে প্রতি ওয়াক্তের নামাজ পড়া হয়েছে, এই দুই সময়ের মাঝে হলো তোমাদের জন্য সেই ওয়াক্তের নামাজ।
এই হলো একজন শিক্ষক নবীর পাঠদানের পদ্ধতি। তিনি চাইলে মুখেই সাহাবির প্রশ্নের জবাব দিয়ে বিদায় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। শিক্ষাদানে তিনি এমন এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন, শিক্ষার্থী যত দুর্বল মেধার অধিকারী হোক, ভুলে যাওয়ার তাঁর কোনো উপায়ই নেই।
শিক্ষার্থী নিজের জীবন যখন উত্তরের ভেতর দিয়ে জারিত হন, তখন তাঁর আর ভুলে যাওয়ার কোনো উপায়ই থাকে না। এভাবেই নবীজি (সা.) স্থান-কাল-পাত্রভেদে একেক সাহাবিকে একেকভাবে শিক্ষাদান করতেন।
(প্রজ্ঞায় যার উজালা জগৎ থেকে)